কারিগরি শিক্ষায় বয়স বিতর্ক

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২০, ২১:৫৪

সরকার ঘোষিত রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নে কারিগরি শিক্ষার উপর জোর দেওয়া হইতেছে। আমরা এই শিক্ষাব্যবস্থার সম্প্রসারণে বরাবরই গুরুত্ব প্রদান করিয়া আসিতেছি। সম্প্রতি কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার বৃদ্ধি ও বিদেশফেরত দক্ষ শ্রমিকদের স্বীকৃতি প্রদানের লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় হইতে দেশের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সে ভর্তির নীতিমালায় বয়স অবারিত করা হইয়াছে। অর্থাত্ যে কোনো বয়সের শিক্ষার্থী চাহিলেই এখন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হইতে পারিবেন। এমনকি এই জন্য ন্যূনতম জিপিএ-৩.৫০ হ্রাস করিয়া ২.৫০ করা হইয়াছে। ইহাতে বিদেশফেরত দক্ষ শ্রমিকরা এবং যাহারা মধ্যপথে বেকারত্বের অভিশাপ বহিয়া বেড়াইতেছেন, তাহারা আশার আলো দেখিতেছেন। তাহারা বিভিন্ন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট হইতে বিভিন্ন কোর্সের সার্টিফিকেট অর্জন করিয়া নিজেরা আত্মকর্মসংস্থানের পথ করিয়া লইতে পারেন এবং সমাজে আত্মমর্যাদার সহিত বসবাস করিতে পারেন। যেহেতু পোশাকশিল্পের পর আমাদের অর্থনীতির দ্বিতীয় প্রাণভোমরা বিদেশি রেমিট্যান্স, তাই প্রবাসী শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার এই ধরনের উদ্যোগ লইয়াছে। তাহা ছাড়া যাহারা অধিক বয়সে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তি হইবেন, তাহারা সরকারের নিকট হইতে চাকুরির নিশ্চয়তা চাহিতেছেন না। তাহারা একটি সার্টিফিকেট লাভ করিয়া নিজেদের ধন্য মনে করিতে চাহেন; কিন্তু ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা ইহা মানিয়া লইতে চাহিতেছেন না। তাহারা বরং ভর্তির নীতিমালা পরিবর্তন না করা হইলে কঠোর আন্দোলনের হুমকি প্রদান করিতেছেন।

ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের সংগঠন ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারস, বাংলাদেশ (আইডিইবি)-এর নেতৃবৃন্দ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়া বলিতেছেন, ইহাতে দেশের কারিগরি শিক্ষা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে গিয়া দাঁড়াইবে। পলিটেকনিক শিক্ষায় দেখা দিবে বিশৃঙ্খলা। বিশেষ করিয়া তাহাদের দাবি, পিতৃতুল্য, বিবাহিত বা বড় ভাইয়ের বয়সি শিক্ষার্থীদের সহিত কোমলমতি শিক্ষার্থীরা পাশাপাশি ক্লাস করিতে পারে না। ইহাতে তাহাদের মানসিক ভারসাম্যের ব্যাপক ফারাক তৈরির কারণে নষ্ট হইবে শ্রেণিকক্ষের ভারসাম্য। শিক্ষকরা তাহা সামাল দিতে পারিবেন না এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীরা কারিগরি শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারাইয়া ফেলিতে পারেন। ইহা কোনো শক্তিশালী যুক্তি নহে।

কারিগরি শিক্ষায় সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, বয়স্ক ও বিদেশফেরতদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর এনএসডিএ ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এনটিভিকিউএফের আওতায় তাহাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া যাইতে পারে। এইভাবে তাহারা বিদেশে চাকুরি বা উদ্যোক্তা তৈরিতে নিজেদের প্রস্তুত করিতে পারেন। বয়স্কদের যদি ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়িতেই হয়, তাহা হইলে তাহাদের জন্য পৃথক সরকারি বা বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট গড়িয়া তোলা যাইতে পারে। কিংবা প্রসিদ্ধ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলিতে তাহারা সন্ধ্যাকালীন কোর্সে ভর্তি হইতে পারেন। আমরা মনে করি, সরকার এই ক্ষেত্রে এমন ফরমুলা গ্রহণ করিতে পারে। সরকার কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়া শিক্ষার্থী ভর্তির হার নির্ধারণ করিয়াছে ২০২০ সালে ২০ শতাংশ, ২০৩০ সালে ৩০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালে ৫০ শতাংশ। উন্নত অনেক দেশ কারিগরি শিক্ষার উপর নির্ভর করিয়াই নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন সাধন করিয়াছে। সুতরাং এই শিক্ষার প্রতি আমাদের আরো যত্নবান হইতে হইবে এবং এই ক্ষেত্রে বাড়াইতে হইবে বিনিয়োগ।