পুনঃপাঠ

‘জ’ বর্ণের প্রতি গোপন অনুরাগ

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২০, ২১:৪২

‘জ’ বর্ণটির প্রতি আমার একটা পক্ষপাত। ‘জ’-কে আমার ভালো লাগে। কেন ভালো লাগে, বলতে পারব না। কোনো যুক্তি দ্বারা সমর্থিত নয় এই ভালোলাগা।

‘জ’-এর কোনো আলাদা জৌলুস নেই, বরং এই ব্যঞ্জনবর্ণটি দেখতে একটু বিচ্ছিরি। ‘জ’ লেজঝোলা বটে, কিন্তু হলদে কোনো লেজঝোলা পাখির মতো সুন্দর নয়, তবু ‘জ’-এর দিকে মাঝে-মধ্যে তাকিয়ে থাকি। ছেলেবেলায় যখন প্রথম শ্লেটে বর্ণমালা লেখা মকশো করেছি, তখন কি জানতাম যে এই লেজঝোলা বর্ণটির প্রতি একটি পক্ষপাত জন্মে যাবে আমার?

ভাবতে ভালো লাগে, জন্ম, জমি (জমিনও বটে), জায়া— এই তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শব্দের সঙ্গে ‘জ’ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ‘জ’ ছাড়া যেমন জলের কোনো অস্তিত্ব নেই, তেমনি জল ছাড়া জীবন অচল; এই জীবনও পুরোপুরি ‘জ’-নির্ভর। আবার জাহাজ শব্দটি আমার খুব প্রিয়। ছেলেবেলায় মধ্যরাতে দূর থেকে ভেসে আসা জাহাজের ‘ভোঁ’ শুনে শিরায় শিরায় রহস্যের ঢেউ খেলে যেত। জাহাজের বাঁশি আমাদের  ঘরে, বিছানায় শুয়ে শুয়ে মনে হতো, টলটলে জোত্স্নার মতো জল ছড়িয়ে দিত রাশি রাশি। আমার চৌকিটা সেই মুহূর্তে জাহাজে রূপান্তরিত হতো। এভাবে ছেলেবেলায় যে কতবার সমুদ্রযাত্রায় মেতেছি  তার কোনো লেখাজোখা নেই। আর কী আশ্চর্য আমার এই অতি প্রিয় জাহাজ শব্দটির আদিতেই বেশি জাঁকিয়ে বসে আছে ‘জ’।

‘জ’-এর মতো অন্য কোনো বর্ণ এত প্রিয় নয় আমার। ‘জ’ নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করে আমার হূদয়ে, আমার চৈতন্য-প্রবাহে। ‘জ’-এর মধ্যে দেখি আমার নিরুপমাকে। নিরুপমার মুখ আর ‘জ’ মাঝে-মধ্যে একাকার হয়ে যায়। যে নিরুপমা তার মুখাবয়ব কখনো নয় ‘জ’-এর মতো। তবু কেন যখন ‘জ’-এর সঙ্গে সাক্ষাত্ হয় বইয়ের পাতায়, তখন ঝলসে ওঠে কি নিরুপমার মুখ? বলতে পারি না। বলা মুশকিল। এটুকু জানি, কোনো কোনো অলস মুহূর্তে ‘জ’-কে সাদরে কাছে ডাকতে ইচ্ছে হয়। ‘জ’ কোনো মানব-মানবীও নয়, শুধু একটি বর্ণ, একটি অক্ষর—যে অক্ষরটি মুখস্থ করার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়তাম ছেলেবেলায়। এই যে ‘জ’-এর প্রতি আমার এই প্রবল লজিকছুট আকর্ষণ—একে কী বলবেন মনোবিজ্ঞানীরা? এই বাক্যটি লেখার সঙ্গে সঙ্গে ‘জ’-এর প্রতি আমার এই অনুরাগের একটা ক্ষীণ যোগাযোগ খুঁজে পেয়েছি যেন। কিন্তু সে কথা কাউকে বলা চলে না। এমনকি খাতায় খাতায় লিপিবদ্ধ করাও অসম্ভব। এই গোপনতা আমাকে বয়ে বেড়াতে হবে।

২০ জানুয়ারি ১৯৭৩

শামসুর রাহমানের ‘একান্ত ভাবনা’ বই থেকে