একটি প্রায় ৭ হাজার বর্গমিটারের মাঠে ৯০ মিনিট ধরিয়া দৌড়াইয়া বেড়াইতে কী পরিমাণ শারীরিক সক্ষমতার প্রয়োজন, তাহা সবচাইতে ভালো বুঝা যায় ফুটবল খেলিবার সময়। আমাদের শারীরিক সক্ষমতা পৃথিবীর অধিকাংশ নৃতাত্ত্বিক জাতির চাইতে কম। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমরা যখন ফুটবল খেলি, তখন তাহা আরো স্পষ্ট হইয়া উঠে। এই জন্য ফিফার র্যাংকিংয়ে আমরা দিনকে দিন নিচের দিকে নামিতেছি। ফিফার সর্বশেষ র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮৭তম। ১৯৯২ সাল হইতে এই র্যাংকিংয়ের তালিকা ফিফার ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে। সেইখানে দেখা গিয়াছে, বিগত ২৮ বত্সরে আমরা সকলের চাইতে ভালো অবস্থানে ছিলাম কেবল ১৯৯৩ সালে। তখন বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১১৬তম। ২০০৮ সালে ছিল ১৭৪তম, আর তাহার পরের বত্সর বিস্ময়করভাবে ১৪৯তম অবস্থানে আসিয়াছিল বাংলাদেশের ফুটবল। কিন্তু তাহার পর কেবল পতনের ইতিহাস। নামিতে নামিতে ২০১৭ সালে ১৯৭তম স্থানে চলিয়া আসিয়াছিল বাংলাদেশ।
অথচ একসময় ফুটবল ছিল বাংলাদেশের প্রধান জনপ্রিয় খেলা। এখন ক্রিকেট। যদিও বিশ্বে ফুটবলের জনপ্রিয়তার পারদ দিনদিন আরো বাড়িয়াই চলিতেছে। আশি-নব্বইয়ের দশকে দেশের আনাচকানাচে আবাহনী-মোহামেডানের ফুটবল ম্যাচ লইয়া যেই উন্মাদনা হইত, বর্তমান প্রজন্ম তাহা কল্পনাও করিতে পারিবে না। তাহারা এখন ফুটবল বলিতে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল কিংবা ইউরোপিয়ান ক্লাবগুলিকে বুঝিয়া থাকে। অথচ বাংলাদেশের ফুটবলের পথচলা শুরু স্বাধীনতার পূর্ব হইতেই। দীর্ঘসময়ের পরিক্রমায় আসিয়াছেন জার্মানি-অস্ট্রিয়া-ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার কোচরাও। কিন্তু এত বত্সরেও ফুটবলের প্রকৃত উন্নয়নে আমরা সুদূরপ্রসারী কোনো লক্ষ্য ঠিক করিতে পারি নাই। আমরা আগামী তিন বা পাঁচ বা সাত বত্সরে কোথায় যাইব, কোথায় যাইতে চাই এবং আমরা কোন কোন জায়গায় শক্তিশালী হইতে চাই—সেই জায়গাগুলি স্থির করি নাই। ইহার বাহিরে নূতন খেলোয়াড় তৈরির জন্য যেই সকল কাজ—যেমন ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট, জেলা পর্যায়ের খেলা, স্কুলের বা বয়সভিত্তিক খেলার দিকে এই আমাদের প্রধান সংস্থার কোনো টেকসই কিংবা কার্যকর পরিকল্পনা নাই। এই জন্য শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের হইয়া খেলা আরিফ এখন রাজমিস্ত্রি। বাসাবো তরুণ সংঘের হইয়া খেলা হাসান আল মামুন এখন ইজিবাইক চালক। ফরিদপুরে ঝাড়ুদারের কাজ করিতেছেন রিপন কুমার, যিনি টিঅ্যান্ডটি ক্লাবের হইয়া খেলিতেন। অনেকেই তাই মনে করেন, বাংলাদেশের ফুটবলের ভবিষ্যত্ এখন যেন আরিফ, রিপন আর মামুনদের জীবনের মতো বেদনাদায়ক। অথচ ফিফা ও এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) বাফুফেকে প্রতি বত্সর ১২ লক্ষ মার্কিন ডলার সহায়তা দেয়। সরকারও গত অর্থবত্সরে বাফুফেকে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়াছে। ইহা ছাড়া স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক স্পনসরের অর্থের পরিমাণও কম নহে।
ক্রিকেটে ফুটবলের মতো কঠিন শারীরিক শক্তি বা ক্ষমতা লাগে না বলিয়া কি ফুটবল হইতে বাংলাদেশের মানুষ মুখ ফিরাইয়া লইয়াছে? কিন্তু আমাদের শারীরিক সক্ষমতার কাছাকাছি দক্ষিণ এশিয়ার যেই সকল দেশ রহিয়াছে, তাহাদের নিকট তো আমরা ভালো ফল প্রত্যাশা করিতে পারি! অথচ খুব সহজেই আমরা এখন ভুটানের মতো ছোট দেশের নিকটও পরাজিত হইতেছি। সুতরাং কোমায় চলিয়া যাইবার পূর্বেই ফুটবলকে বাঁচানো প্রয়োজন।
