পানিতে ডুবিয়া শিশুর মৃত্যু

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২০, ২১:৫৪

এই বত্সর দেশে দফায় দফায় বন্যা হইতেছে। সিরাজগঞ্জে তিন দফায় বন্যার ক্ষত না শুকাইতেই আবার যমুনায় পানি বাড়িতে শুরু করিয়াছে। ব্রহ্মপুত্রের পানিও বাড়িবার আশঙ্কা করা হইতেছে। ঘরে ঘরে পানি প্রবেশ করায় দিশাহারা বন্যাদুর্গতরা। বর্তমানে ৩৩টি জেলায় বন্যা পরিস্থিতি এখনো অস্বাভাবিক। এই সময় আমাদের দেশে পানিতে ডুবিয়া শিশুর মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পায়। সাঁতার না জানা ডুবন্ত ব্যক্তি এমনিতেই সাহায্যের জন্য চিত্কার করিতে পারে না বা কথা বলিতে পারে না। তাহার উপর ডুবন্ত ব্যক্তিটি যদি হয় শিশু, তাহা হইলে অনেক ক্ষেত্রে কিছুই করার থাকে না। বেসরকারি সংস্থা দুর্যোগ ফোরামের এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, গত এপ্রিলে ১৩৫, মে মাসে ১৯২, জুন মাসে ৪৮৭ এবং জুলাই মাসে ৬৫২ শিশু পানিতে ডুবিয়া মারা গিয়াছে। ঈদের ছুটিতে ১২ দিনের ব্যবধানে পানিতে ডুবিয়া মারা গিয়াছে ৬৯ শিশু। এক গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশে এখন প্রতি বত্সর প্রায় ১৫ হাজার শিশু পানিতে ডুবিয়া মারা যাইতেছে। অনেক মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় না। ফলে পরিসংখ্যানগত পার্থক্য থাকাটা অস্বাভাবিক নহে।

পানিতে ডুবিয়া শিশুর মৃত্যুবরণের ব্যাপারে আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। নানা প্রতিষেধক আবিষ্কার আর সমন্বিত টিকাদান কর্মসূচির ফলে অসুখবিসুখে শিশুর মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়াছে; কিন্তু ইদানীং বিভিন্ন দুর্ঘটনায় শিশুর মৃত্যুর হার বাড়িয়া গিয়াছে উদ্বেগজনকভাবে। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতিদিন নানা দুর্ঘটনায় গড়ে ১২৫ শিশু মারা যায়। তাহার মধ্যে ২৪ শতাংশই মারা যায় পানিতে ডুবিয়া। বর্ষাকালে বা বন্যার সময় ইহার হার বাড়িতে থাকে; কিন্তু অন্যান্য সময়ও শিশুর পানিতে নিমজ্জিত হইয়া মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এইরূপ ৮০ শতাংশ দুর্ঘটনাই ঘটে বাড়ির সীমানা বা ঘরের ২০ মিটারের মধ্যে; আশপাশের পুকুর, জলাশয় বা ডোবায়। এমনকি ঘরের মধ্যে রাখা গামলা বা বালতির পানিতে পড়িয়াও শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ইহা বাবা-মায়ের চরম অবহেলা ও অসতর্কতারই নজির। আবার গবেষণায় দেখা যাইতেছে, সকাল ১০টা হইতে বিকাল ২টার মধ্যেই ৬০ শতাংশ শিশু পানিতে ডুবিয়া মারা যায়। এই সময় সাধারণত মা রান্নার কাজে এবং বাবা অর্থ উপার্জনের জন্য ঘরের বাহিরে থাকেন। অনেক সময় শহর অঞ্চলের শিশুরা গ্রামের বাড়িতে বেড়াইতে আসিয়া সাঁতার না জানিবার কারণে পুকুর-ডোবায় পড়িয়া মৃত্যুবরণ করে। তাহারা বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে গোসল করিতে নামিয়াও মারা যায়।

পানি হইতে উদ্ধারের সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় শিশুকে বাঁচানো যাইতে পারে। তবে কীভাবে তাহার শ্বাসপ্রশ্বাস চালু করিতে হইবে এই সম্পর্কে আমাদের প্রাথমিক চিকিত্সাজ্ঞান থাকা প্রয়োজন। যেই সকল শিশু ডুবিতে গিয়া বাঁচিয়া যায়, তাহাদের ব্যাপারে আরো যত্নবান হওয়া দরকার। অনেক সময় মস্তিষ্কে অক্সিজেন চলাচল বন্ধের কারণে শারীরিক বা মানসিক নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। এই জন্য চিকিত্সকের শরণাপন্ন হইতে হইবে। শিশুরা যাহাতে সকলের অলক্ষে বাড়ির বাহিরে যাইতে না পারে, এই জন্য শিশুর নিবিড় দেখাশুনার জন্য সমন্বিত শিশুযত্ন কেন্দ্রও তৈরি করা যাইতে পারে। বন্যাদুর্গত এলাকায় শিশুদের নিরবচ্ছিন্ন দেখাশুনার ব্যবস্থা করিতে পারিলে এই পরিস্থিতির উন্নতি হইবে নিঃসন্দেহে। অনেকে এই জন্য ভারতের কেরালা মডেল অনুসরণের কথা বলেন। তবে পরিবারের অন্য সদস্যদের বা প্রতিবেশীদেরও এই ব্যাপারে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করিতে হইবে।