আইসিটি খাতে চাই দক্ষ জনবল

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২০, ২১:৫৫

বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে নব প্রজন্মের জন্য কর্মক্ষেত্র তৈরি করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমান বিশ্ব তথ্যপ্রযুক্তির ওপর দণ্ডায়মান। ইনফরমেশন টেকনোলজিতে যে জাতির দক্ষতা যত বেশি তারা তত বেশি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশেও শিক্ষার্থীরা কম্পিউটার বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনায় আগ্রহী হয়ে উঠেছে। দেশে প্রতি বছর ১৫ থেকে ৩০ হাজার আইসিটি গ্র্যাজুয়েট তৈরি হচ্ছে; কিন্তু কাজের বিবেচনায় বেশির ভাগ গ্র্যাজুয়েট অদক্ষ থেকে যাচ্ছে। অদক্ষ জনসম্পদ নিয়ে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অগ্রসর হওয়া প্রায় অসম্ভব। আমাদের আছে বিপুল জনগোষ্ঠী, শুধু অভাব সঠিক পরিকল্পনা ও কর্মপন্থা। আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের যদি বিশ্বমানের করে গড়ে তুলতে পারতাম তাহলে দেশে বসেই আমরা বিশ্বের আইসিটি সম্পর্কিত চাকরিগুলোতে যুক্ত হয়ে যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করতে সক্ষম হতাম। বাস্তবে চাকরির ক্ষেত্রে আইসিটি গ্র্যাজুয়েটদের বিষয়ে উলটো চিত্র প্রতীয়মান। প্রতি বছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কম্পিউটার গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে; কিন্তু আমরা আমাদের দেশে অবস্থিত বহুজাতিক কোম্পানির জন্য ভালো প্রোগ্রামার খুেঁজ পাচ্ছি না। অনন্যোপায় হয়ে কোম্পানিগুলো গ্র্যাজুয়েট নিয়োগ দিয়ে তিন মাসের ইন্টার্নশিপ করিয়ে তাদেরকে কাজের উপযোগী করে নিচ্ছে।

দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়ে সঠিক পরিকল্পনা ও কর্মপন্থা প্রণয়নের পূর্বে জানতে হবে কম্পিউটার প্রোগ্রাম কী? কম্পিউটার বুঝতে পারে এমন ভাষায় লিখিত কোনো সমস্যার গাণিতিক সমাধান হলো প্রোগ্রাম। প্রোগ্রামকে বলা যেতে পারে অঙ্ক এবং কলার (আর্ট) সমন্বয়। দক্ষ প্রোগ্রামার হওয়ার শর্ত যেমন ভালো অঙ্ক জানা, তেমনি ভালো অঙ্ক জানা ও সমস্যার অঙ্কীয় সমাধান করার ক্ষমতা হলো মনের সঙ্গে কথা বলা অর্থাত্ চিন্তা করা। ২৩ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতায় পাবলিক প্রাইভেট উভয় প্রতিষ্ঠানেই দেখেছি বাস্তব উপলব্ধিগত কিছু দুর্বলতা দক্ষ আইসিটি গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে অন্তরায় হয়ে আছে।

কী সেই দুর্বলতা? কোনো বিশেষ সাবজেক্টে চার বছর পড়াশোনার পর যখন কোনো গ্র্যাজুয়েট ঐ বিষয় নিয়ে কাজ করতে ভীত বা দ্বিধাগ্রস্ত থাকে তখন আমরা ঐ গ্র্যাজুয়েটকে অদক্ষ গ্র্যাজুয়েট বলতে পারি। কম্পিউটার সায়েন্স, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং, আইসিটি ইত্যাদি বিষয়ে মানসম্মত ডিগ্রি লাভের সঙ্গে প্রোগ্রামিং দক্ষতার একটি নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে। এই প্রোগ্রামিং দক্ষতায় আমাদের গ্র্যাজুয়েটগণ পিছিয়ে আছে। পিছিয়ে থাকার প্রধান ও প্রথম কারণ প্রোগ্রামিংয়ের প্রতি ভয়। ভয় কেন তৈরি হচ্ছে? আমার মতে শিক্ষার্থীরা যখন প্রোগ্রাম শুরু করে তখন তাদের কম্পাইলার সম্পর্কে সীমিত ধারণা থাকার কারণে ল্যাবে ক্লাস চলাকালীন কোনো ভুল করলে আর তারা ঠিক করতে পারে না। ফলে তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং ব্যবহারিক ক্লাস তাদের কাছে নিরানন্দের হয়ে ওঠে; কিন্তু ইন্টারনেটের যুগে তারা কপি পেস্টের মাধ্যমে তাদের ল্যাবের অ্যাসাইনমেন্ট, প্রোগ্রাম ইত্যাদি জমা দেয়। আমি সবার কথা বলছি না। তবে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী এই পদ্ধতি অবলম্বন করে। ফলে তাদের প্রোগ্রামিং দক্ষতা দুর্বলতার তিমিরেই থেকে যায়।

অনলাইন ক্লাসে জুমের ব্যবহার আমাদেরকে একটি নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। জুমের মাধ্যমে প্রোগ্রামিং সম্পর্কিত দক্ষতা বাড়ানোর জন্য কোনো অতিরিক্ত খরচ করতে হবে না। শুধু প্রশিক্ষক ও জুম চালনার খরচ বহন করতে পারলেই ইচ্ছুক এবং উত্সাহী গ্র্যাজুয়েটদের তিন মাসের চেষ্টায় বিশ্বমানের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। এর জন্য প্রথমত প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখা প্রোগ্রামারদের প্রশিক্ষক হিসেবে নির্বাচন করতে হবে। দেশ ও দশের স্বার্থে তাদেরকে সন্তোষজনক সম্মানি দিয়ে সপ্তাহে এক দিন প্রশিক্ষণ দিতে রাজি করাতে হবে। আইসিটি মন্ত্রণালয়ের টিয়ার ফোর ডাটা সেন্টার স্থাপনে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি সেখানে শত কোটি থেকে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প রয়েছে; এখন দরকার বিশ্বমানের আইসিটি জনবল। আগেই বলেছি প্রোগ্রামিংয়ে ভালো করতে হলে কম্পাইলারের ভেতর ও বাহির ভালোভাবে জানতে হবে। প্রোগ্রাম কীভাবে লাইন বাই লাইন কাজ করে তা দেখতে-শিখতে হবে। চলকগুলোর ডাটা বিভিন্ন পর্যায়ে কীভাবে পরিবর্তন হচ্ছে তা নিরীক্ষণ করা শিখতে হবে। প্রসিডিউর বা ফাংশন কীভাবে এবং কোন ডাটা পাস করে তা দেখতে শিখতে হবে। অর্থাত্ প্রোগ্রাম ডিবাগিংয়ের ক্ষেত্রে কোনো অপশন শিক্ষার্থীদের জন্য অজানা রাখা চলবে না। শিক্ষার্থী যখন নিজেই নিজের প্রোগ্রামের ভুল ধরতে পারবে এবং প্রোগ্রামের অ্যানাটমি বুঝতে পারবে তখন সে প্রোগ্রামের গভীরে প্রবেশের উত্সাহ ও উদ্দীপনা পাবে। ফলে সে দক্ষ প্রোগ্রামারে পরিণত হবে।

প্রোগ্রামিং বিষয়ে উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরো একটি বিষয় করণীয়। একটি বহুজাতিক কোম্পানির তথ্য মতে, পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি বেতনপ্রাপ্ত প্রোগ্রামাররা হলো রাশিয়া, ইউক্রেন ও পোল্যান্ডের। অর্থাত্ এসব দেশে বিশ্বমানের প্রোগ্রামার তৈরি হয়। খবরে পড়েছিলাম আমেরিকায় সার্ভার হ্যাক করে ইনফরমেশন নিয়ে যায় রাশিয়ানরা। প্রোগ্রামের মাধ্যমে আমেরিকানদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোটকে প্রভাবিত করেছে তারা। আবার করোনাকালে দেখলাম অক্সফোর্ড অভিযোগ করছে রাশিয়ানরা তাদের সার্ভার হ্যাক করে ভ্যাক্সিনের তথ্য জেনে নিয়ে নিজেরা ভ্যাক্সিন তৈরি করে ফেলেছে। খবরগুলো বিশ্বের ভুক্তভোগী দেশগুলোর জন্য উদ্বেগের বিষয় হলেও রাশিয়ানদের প্রোগ্রামিং জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বহন করে নিঃসন্দেহে। সরকারের উচিত প্রোগ্রামিংয়ে দক্ষ দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করা। যাতে প্রোগ্রামিং সংশ্লিষ্ট অঙ্ক, অ্যালগরিদম, ডিবাগিং ও কোডিং শেখানোর জন্য আমরা প্রয়োজনে তাদের দক্ষ প্রশিক্ষককে নিয়োগ দিতে পারি। এক্ষেত্রেও জুমের ব্যবহার আমাদের এমন পরিকল্পনাকে সাশ্রয়ী করবে। জুমের আরো একটি সুবিধা হলো—প্রত্যেক গ্র্যাজুয়েট বিনা দ্বিধায় একাধিকবার কোর্সে অংশ্রগ্রহণ করতে পারবে। মেধার তারতম্যের কারণে একবারে যদি সবকিছু শিখতে না পারে তখন দ্বিতীয়, এমনকি তৃতীয় বার শিক্ষার্থীরা অনলাইন ট্রেনিংয়ে অংশগ্রহণ করতে পারবে। প্রোগ্রামিং দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য অনলাইনে বিভিন্ন পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। গ্র্যাজুয়েটরা নিজেদের যখন প্রত্যয়ী মনে করবে তখন অনলাইন পরীক্ষা দিয়ে তাদের যোগ্যতা যাচাই করে নিতে পারবে।

সঠিক কর্মপরিকল্পনার সুফল পেতে সরকারকে অনলাইন ট্রেনিং সারা বছর চালু রাখতে হবে। মানব সম্পদ উন্নয়নের এই অব্যর্থ পন্থা যদি কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করে তাহলে কোনো মেগা প্রকল্প ছাড়াই সাশ্রয়ীমূল্যের মধ্যেই দেশকে অবিশ্বাস্য গতিতে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। এতে তরুণ প্রজন্ম হবে হতাশামুক্ত, উদ্দীপ্ত ও ভবিষ্যত্ সম্ভাবনার আধার।

n লেখক : অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর-১৭০৭