ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বুধবার এক টুইট বার্তায় পূর্ব ভূমধ্যসাগরে রাফায়েল যুদ্ধবিমান ও নৌবাহিনী ফ্রিগেট ‘লাফায়েট’ ঐ অঞ্চলে প্রেরণ করবেন বলে তুরস্ককে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তুরস্ককে হুঁশিয়ারি দেওয়ার কারণ হলো—পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্ক তাদের জারি করা ‘সার্ভে অ্যালার্ট’-এর অংশ হিসেবে গ্রিসের কাস্টেলপারিসো দ্বীপের কাছে ‘ওরুচ রেইচ’ নামে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকারী জাহাজ পাঠিয়েছে এবং গত সপ্তাহে গ্রিসের দুইটি দ্বীপ ঘেঁষে নৌ-মহড়া চালিয়েছে। গ্রিসকে সতর্ক করতে আঙ্কারার এই নৌ-মহড়া চালানোর কারণ হলো—সম্প্রতি (৬ আগস্ট) গ্রিস ও মিশর এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন (ইইজেড) নামে একটি নতুন বিশেষ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্দেশ্য হলো পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের তত্পরতা কমিয়ে আনা। বস্তুত, গত বছরের নভেম্বরে লিবিয়ার সঙ্গে তুরস্কের যে চুক্তি হয়েছিল তার পালটা পদক্ষেপ হিসেবেই এই চুক্তি। আয়া সোফিয়াকে জাদুঘর থেকে মসজিদে রূপান্তর করায় গ্রিসসহ ভূমধ্যসাগরের উপকূলবর্তী বেশ কয়েকটি দেশ বেজায় খেপেছে। ন্যাটোভুক্ত দেশ দুইটির এমন পালটাপালটি অবস্থান প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে পরিণত হতে যাচ্ছে; কিন্তু এই দ্বন্দ্ব শুধু তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এই খেলাটা যেহেতু সম্পদের সেহেতু কাকের অভাব হওয়ার কথা নয়! তীর্থের কাকেরা একের পর এক গ্রিসের সহযোগিতায় এগিয়ে আসছে। তাই যুদ্ধের শঙ্কাও আরো প্রকট হতে যাচ্ছে। ২০১৫ সালে গ্রিস যখন অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়েছিল তখন এরা ছিল কোথায়? গ্রিসের সঙ্গে আছে মিশর, ফ্রান্স, লেবানন, জর্দান ও ইসরাইল। আর তুরস্কের সমর্থনে আছে লিবিয়া ও উত্তর সাইপ্রাস। লিবিয়া সংকট ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরের এই আসন্ন সংকট ভূরাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত। লিবিয়ায় তুরস্ক ও মিশর, ফ্রান্স মুখোমুখি অবস্থানে আছে, আর এখানেও তারা বৈরীভাবই প্রকাশ করছে। আসলে তুরস্ক ও গ্রিসের মধ্যে বিরোধ নতুন নয়; বেশ পুরোনো। সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে উভয়ের ঘারেই চাপছে শরণার্থীর বোঝা। চলতি বছরের প্রথম থেকে অভিবাসী সমস্যা নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে; কিন্তু পূর্ব ভূমধ্যসাগর এলাকা থেকে খনিজ সম্পদ উত্তোলনের জন্য তারা একে অপরের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছে। সম্প্রতি সাইপ্রাস দ্বীপের উপকূলে সাগরে অঢেল গ্যাসের সন্ধান মেলায় সাইপ্রিয়ট সরকার, গ্রিস, ইসরাইল ও মিশর এই সম্পদ ব্যবহারের জন্য একযোগে কাজ করতে উদ্যোগী হয়। এ ব্যাপারে একটা চুক্তিও হয়েছে। ভূমধ্যসাগরের নিচ দিয়ে ২ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মিত হবে এবং তা দিয়ে গ্যাস সরবরাহ করা হবে ইউরোপে। তুরস্কের নাকের ডগায় সম্পদ দখলের এমন দৃশ্য দেখার পর তুরস্ক কি আর চুপ থাকতে পারে? সেও গত বছর সাইপ্রাসের পশ্চিম দিকে গ্যাসকূপ খননের কাজ জোরদার করে এবং লিবিয়ার সঙ্গে চুক্তি করে। আঙ্কারার বক্তব্য, এর মাধ্যমে তারা তুরস্কের দক্ষিণ উপকূল থেকে লিবিয়ার উত্তর-পূর্ব তীর পর্যন্ত একটি বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা তৈরি করেছে; কিন্তু এথেন্স আঙ্কারার এই দাবি মানছে না। কেননা, তুরস্ক ও লিবিয়ার মধ্যখানে যে গ্রিসের একটি দ্বীপ ‘ক্রিট’-এর অবস্থান বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। দুই দেশের এই বিবাদ তেল-গ্যাস আহরণ নিয়ে হলেও এর কারণে কিন্তু দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন জিইয়ে থাকা সমুদ্রসীমার বিরোধ সামনে চলে এসেছে। সীমানা নির্ধারিত থাকলেও এর মধ্যে বেশ ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। যেমন, পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও এজিয়ান সাগর এলাকায় গ্রিসের কতিপয় দ্বীপ আছে যা তুরস্কের খুব কাছে এবং উপকূল থেকে দেখা যায়। ফলে এখানে কার সমুদ্রসীমা কোথায়, তা নির্ধারণ করা বেশ দুরূহ ব্যাপার। আবার, গ্রিস যদি তার সমুদ্রসীমা ছয় মাইল থেকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ১২ মাইল পর্যন্ত সম্প্রসারিত করে তাহলে তুরস্কের দাবি অনুযায়ী তার নিজের সমুদ্রপথগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অতীতে এ নিয়ে উভয়ে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল। এই বিষয়কে কেন্দ্র করে বড় বড় শক্তি বিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জার্মানিও গ্রিসকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। তুরস্কের সঙ্গে বড় কোনো শক্তির সমর্থন না থাকলেও তাদের নিজস্ব শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। তুরস্কের দাবি, তারা জাতিসংঘের সমুদ্র আইন অনুসারেই সব কার্যক্রম চালাচ্ছে। আর লিবিয়াতেও তারা জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারকেই সাহায্য করেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুরস্কের অগ্রযাত্রাকে বড় শক্তিগুলো ভালোভাবে দেখছে না। আয়া সোফিয়াকে কেন্দ্র করে সেই ক্ষোভ আরো ঘনীভূত হয়েছে। পূর্ব ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে এমন উত্তেজনা হ্রাস করে শান্তি ফিরিয়ে আনতে গ্রিস ও তুরস্কের মধ্যে আলোচনা জরুরি হয়ে পড়েছে। যার নেতৃত্বে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জার্মানি থাকতে পারে। শান্তি আলোচনার মাধ্যমেই এই বিরোধ নিষ্পত্তি করা সম্ভব। কিন্তু অন্যান্য দেশ শান্তিমূলক পদক্ষেপের বদলে যদি ইন্ধন যোগায় বা উষ্ণ পরিস্থিতিতে ঘি ঢালে তবে উভয় পক্ষেরই বেশ ক্ষতি হবে। সেই অশান্তির বাতাস সমগ্র পৃথিবীকে গ্রাস করতে পারে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
