দখল ও ভরাট হয়ে যাচ্ছে বরিশালের অধিকাংশ খাল

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২০, ২২:১২

রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বরিশালের খালগুলো জলাবদ্ধ ও ভূমিদস্যুদের কবলে পড়ে দখল হয়ে যাচ্ছে। কাগজে-কলমে নগরীতে ৪৬টি খাল থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশেরই অস্তিত্ব নেই। বিগত চার বছর পূর্বে তত্কালীন জেলা প্রশাসক সিটি করপোরেশনের সহযোগিতায় কয়েকটি খাল রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নিলেও তার কোনো সুফল পায়নি নগরবাসী। ফলে প্রবাহমান খালগুলো এখন ভরাট ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দখল হয়ে যাচ্ছে। এতে পার্শ্ববর্তী সড়কসহ জনবহুল এলাকা জোয়ারের পানিতে নিমজ্জিত থাকছে। গত কয়েক দিন ধরে জোয়ার-ভাটা নির্ভর হয়ে গেছে বরিশাল নগরবাসীর জীবনযাপন। খালগুলো ড্রেনে পরিণত হওয়ায় তা থেকে জোয়ারের পানি সড়কসহ বাসাবাড়িতে প্রবেশ করায় ভাটা না আসা পর্যন্ত জীবন থমকে যাচ্ছে। বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় কীর্তনখোলা নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। গত ১৫ দিন ধরে নদনদীর পানি জোয়ারের সময় বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নগরীতে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।   

৫৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বরিশাল সিটি করপোরেশনের অভ্যন্তরে এক সময় প্রবাহমান ছিল অর্ধশত খাল। এসব খাল দিয়ে চলত যাত্রীবাহী গয়না ও বজরা, পণ্যবাহী নৌকা-ট্রলার। কীর্তনখোলা নদীর জোয়ার-ভাটা এবং নির্মল পরিবেশের কারণে সুখ্যাতি ছিল বরিশালের। খালের নামেও অনেক এলাকার নামকরণ হয়েছে। কিন্তু দখলদারীর কারণে এখন খাল নেই, রয়ে গেছে শুধু নাম। প্রতি বছরই দখলদাররা বর্ষা মৌসুমে পরিকল্পনা করে শুকনো মৌসুমে তা বাস্তবায়ন করে। ফলে বছরে বছরে খালগুলো সংকুচিত হয়ে দখলদারদের বাসা-বাড়িতে রূপ নিয়েছে। অসাধু উপায়ে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে দখলকারীরা ভোগদখল করায় বিভিন্ন অভিযানে তারা পার পেয়ে যাচ্ছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, অর্ধশত খালের অধিকাংশই রয়েছে দখলদারদের দখলে। নগরীর রূপাতলী বটতলা মোড় মসজিদ সংলগ্ন চক্রবর্তীর খাল ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ শুরুর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। সাগরদী খালের দুই পাশে এমনভাবে দখল করা হয়েছে যে, বোঝার উপায় নেই এটি খাল ছিল। লাকুটিয়া খালসহ কাজীপাড়া, সাগরদী, টিয়াখালী, জিয়া সড়ক, আমানতগঞ্জ, নবগ্রাম, ভাটার, কাশীপুর, নাপিতের, চাঁদমারি, পলাশপুর খালও ফের ভরাট ও দখল হয়ে যাচ্ছে। ২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তত্কালীন জেলা প্রশাসক ড. গাজী সাইফুজ্জামান স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপকভাবে বরিশালের খাল দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিলেও তা আর বাস্তবায়িত হয়নি।

নগরীর প্রবীণরা জানান, প্রশাসন বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে কোনো কোনো খালের কিছু অংশ অবৈধ দখলমুক্ত করলেও খালের পুরনো চেহারা ফিরছে না। এমনকি জোয়ার-ভাটায়ও পানি প্রবাহ হচ্ছে না এসব খালে। খালগুলো দখল-ভরাট হয়ে যাওয়ায় প্রতি বছর বর্ষায় সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতার। খাল উদ্ধারের নামে বিভিন্ন সময় উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

বরিশাল সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) জেলা সভাপতি প্রফেসর শাহ সাজেদা জানান, আগামী প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যত্ বিনির্মাণে খালগুলো পুনঃখনন ও অবৈধ দখলমুক্ত করে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক না করলে সংকট প্রকট আকার ধারণ করবে।

 বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ ইত্তেফাককে জানান, তিনি দায়িত্ব নিয়েই সিটি এলাকার ৪৬টি খাল ও ১০টি পুকুর রক্ষায় পরিবেশবান্ধব একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছেন। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বরিশাল পরিবেশবান্ধব নগরীতে পরিণত হবে। পাশাপাশি পর্যটন ও নৌপরিবহনে গুরুত্ব বাড়বে। রোধ হবে নগরীর জলাবদ্ধতা। মেয়র জানান, চার বছর মেয়াদি ২ হাজার ৬১৫ কোটি টাকার প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশন এবং একনেকের অনুমোদন পেলেই কাজ শুরু করা যাবে।