১৫ বছরেও জেএমবির (জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ) সিরিজ বোমা হামলার মামলার বিচারকাজ শেষ হয়নি। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে সিরিজ বোমা হামলা চালায় জঙ্গিরা। একই সময়ে প্রায় সাড়ে ৪০০ স্পটে এভাবে পরিকল্পিতভাবে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার নজির বিশ্বের ইতিহাসে নেই। এ ঘটনায় সারাদেশে ১৫৯টি মামলা দায়ের হয়। পুলিশ ও র্যাব সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে এসব মামলায় জেএমবির সহস্রাধিক সদস্য গ্রেফতার করে। ১৬টি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশ। ১৪৩টি মামলার চার্জশিট প্রদান করেছে। এই মামলার ৯৬টি মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে। ৪৭টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সূত্র জানায়, এসব মামলায় ৩০৫ জন আসামিকে আদালত বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছে। এদের মধ্যে অনেকে সাজা খেটে জেল থেকে বের হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। তাদের বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলা না থাকলে জঙ্গি পথ থেকে ফিরিয়ে এনে তাদের স্বাভাবিক জীবনে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে পুলিশ। এরই মধ্যে সিরিজ বোমা হামলার মামলায় সাজাপ্রাপ্ত সাত জেএমবি সদস্যকে স্বাভাবিক জীবনে পুনর্বাসন করা হয়েছে।
কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘পুরোনো জেএমবির ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আমির সালাহউদ্দিন সালেহীন এখন ভারতে পলাতক। তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম দুর্বল অবস্থায় আছে। জঙ্গিদের ডি রেডিকালাইজেশন এবং পুনর্বাসনের উদ্যোগ রাষ্ট্র নিয়েছে। যারা সাজা ভোগ শেষে বের হয়েছেন, তাদের অধিকাংশই নজরদারিতে আছেন। অধিকাংশই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন। সাজাভোগের পর কেউ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাইলে তাকে সহযোগিতা করা হবে। এমনকি তাদের পুনর্বাসনের জন্য যদি আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হয়, সেটি যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই খাতে সরকারের বরাদ্দ রয়েছে।২০০০ সালে দিনাজপুরের বালুবাড়ীতে বোমা হামলার মধ্যদিয়ে জেএমবি কার্যক্রম শুরু করে। তাদের কার্যক্রম যে একেবারে শেষ হয়ে গেছে তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। ধারণা করা হচ্ছে, জেএমবি তাদের কার্যক্রম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এদের শক্তিশালী নেটওয়ার্কের তথ্য মিলেছে। ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের খাগড়াগড়ে এক বাড়িতে জেএমবির বোমা বিস্ফোরিত হলে দুই জন নিহত হয়। ঐ ঘটনায় ভারতের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএ ৩২ জন জেএমবি সদস্যকে গ্রেফতার করে। ২০১৮ সালের ৭ আগস্ট ভারতের ব্যাঙ্গালুরু থেকে জেএমবির দুর্ধর্ষ পলাতক জঙ্গি বোমারু মিজানকে গ্রেফতার করে ঐ দেশের এনআইয়ে টিম।
সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, বড় ধরনের হামলার সক্ষমতা নেই জেএমবির। যদিও ২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজানের ঘটনাটি নানাভাবে তাত্পর্যপূর্ণ। তবে ঐ সময়ের সক্ষমতার তুলনায় এটি তেমন কিছুই না। জঙ্গিরা সাইবার স্পেসকে তাদের অন্যতম প্লাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করছে। কোভিড আসার পর মানুষ ঘরে বেশি থেকেছে, ফলে জঙ্গিরা অনলাইনে প্রচার-প্রচারণা বেশি চালিয়েছে।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই র্যাব জঙ্গি দমনে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। র্যাবের অভিযানেই জেএমবির প্রধান শায়খ আবদুর রহমান, সেকেন্ড ইন কমান্ড সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাইসহ শীর্ষ জঙ্গি নেতারা গ্রেফতার হয়। তাদের বিচারের মুখোমুখিও করা হয়েছে। জঙ্গিরা এখন সাইবার মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করছে। তবে এ ব্যাপারে র্যাবের সাইবার মনিটরিং সেল খুলে জঙ্গিদের কঠোর নজরদারির মধ্যে আনা হয়েছে। এরই মধ্যে সাইবার মাধ্যমে অপরাধ করার সময় বেশ কয়েকজন জঙ্গিকে র্যাব গ্রেফতার করেছে।
ঢাকা মহানগর আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আব্দুল্লাহ আবু বলেন, ঢাকা মহানগর এলাকায় বোমা হামলার ঘটনায় ১৭টি মামলা হয়েছিল। মামলাগুলো তদন্ত শেষে পুলিশ আটটি মামলার ফাইনাল রিপোর্ট (চূড়ান্ত প্রতিবেদন) জমা দিয়েছে। ৯টি মামলার মধ্যে তেজগাঁও ও বিমানবন্দর থানায় দায়ের করা দুটি মামলাসহ চারটি মামলার রায় হয়ে গেছে। রায়ে বেশ কয়েকজন জঙ্গিকে আদালত বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছেন। বাকি পাঁচটি মামলা বিচারাধীন পর্যায়ে আছে। এর মধ্যে কয়েকটি মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের কাজ চলছে। অনেক মামলায় আসামিদের নাম ও ঠিকানা কিছুই নেই বা ছিল না। সাক্ষীদেরও ঠিকমত পাওয়া যায় না। অনেক সাক্ষী সাক্ষ্য দিতেও আসেন না। বেশির ভাগ সাক্ষীর ঠিকানাও পরিবর্তন হয়েছে। এরকম নানা কারণে মামলা শেষ করতে সময় বেশি লেগে যাচ্ছে। তবে এসব মামলায় বাকি সাক্ষীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী বিচারকার্য সম্পন্ন করতে পারেন আদালত। আশা করি, এই বছরের মধ্যে এই পাঁচটি মামলার বিচার কার্য শেষ হতে পারে।
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলার পর জেএমবির শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাই, আতাউর রহমান সানি, খালেদ সাইফুল্লাহ, আবদুল আউয়াল, হাফেজ মাহমুদসহ প্রায় সাড়ে ৭০০ জঙ্গি সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। ঝালকাঠিতে দুই বিচারক হত্যা মামলায় জেএমবি প্রধান শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাইসহ সাত জনের ফাঁসির আদেশ দেয় আদালত। ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম, খালেদ সাইফুল্লাহ, আতাউর রহমান সানি, আবদুল আউয়াল, ইফতেখার হাসান আল মামুনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ২০১৬ সালের ১৭ অক্টোবর এই মামলার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আসাদুল ইসলাম আরিফের ফাঁসি কার্যকর হয়।
