বিক্ষোভে উত্তাল থাইল্যান্ড ইসরাইল, বেলারুশ

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২০, ০০:৫৭

সরকারের পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল বিক্ষোভ শুরু হয়েছে থাইল্যান্ড, ইসরাইল এবং ইউরোপের দেশ বেলারুশে। তিন দেশের আন্দোলনের ইস্যু ভিন্ন হলেও রাজপথে অবস্থান নেয়া বিক্ষোভকারীরা সরকারের পদত্যাগ ও ব্যাপক প্রশাসনিক সংস্কার আনার দাবি করেছে। লাখো মানুষ এসব বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। গতকাল রবিবারও ব্যাপক বিক্ষোভ হয় এসব দেশে।

আকস্মিক উত্তপ্ত থাইল্যান্ড

সরকারের পদত্যাগ, সংবিধান পরিবর্তন এবং বিরোধী মতের কর্মীদের হয়রানি বন্ধের দাবিতে থাইল্যান্ডে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। তারা রাজতন্ত্রেরও সংস্কার চায়। গতকাল রবিবার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এ দেশটির রাজধানী শহর ব্যাংককে হাজার হাজার মানুষ জমায়েত হয়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ করে। গত মাস থেকে দেশটির শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন গোষ্ঠী প্রায় প্রতিদিন বিক্ষোভ করে আসছিল। কিন্তু আন্দোলন নতুন মাত্রা পায় গতকাল। এদিন দলে দলে হাজার হাজার মানুষ এই আন্দোলনকে এক গণবিক্ষোভে পরিণত করে। এতে নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করে। বিক্ষোভকারীর বর্তমান শাসন কাঠামোর আমূল পরিবর্তন চান।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কুক্কি নামের ২৯ বছর বয়সী স্নাতকোত্তর এক শিক্ষার্থী সংবাদমাধ্যমে বলেন, ‘‘আমরা বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিভিন্ন বয়সের মানুষ এখানে একত্রিত হয়েছি। একনায়কতন্ত্রের পতন হোক, গণতন্ত্রের জয় হোক।’’ বিক্ষোভকারীরা ‘প্রকৃত গণতন্ত্র চাই’, ‘সরকার পদত্যাগ কর’, ‘বিজয় না নিয়ে ফিরব না’ ইত্যাদি শ্লোগান সম্বলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে অবস্থান করেন। বিক্ষোভকারীদের দাবি, গত বছর বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আরোহন করেছে সরকার। তাই প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করে পুনরায় নির্বাচন দিতে হবে।

২০১৪ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রায়ুত চান-ওচার ক্ষমতা দখলের পর থাইল্যান্ডে এটাই সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ। বিশাল এই বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে রাখতে শত শত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করেছে সরকার। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছে, আগামীতে বিক্ষোভ আরও ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে।

আন্দোলনে টালমাটাল বেলারুশ

বেলারুশের বিরোধী দলের নেতৃত্বে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। তারা গত নির্বাচনকে ‘বিতর্কিত’ দাবি করে তা বাতিলের দাবি জানিয়েছে। মিনস্কে গতকাল দিনভর উত্তাল বিক্ষোভ হয়। এতে বিপুল সংখ্যক মানুষ শামিল হয়। গত ৯ আগস্ট বেলারুশে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীদের দমনের জন্য ব্যাপক চেষ্টা করে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার এবং পুলিশি জিম্মায় একাধিক বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হওয়ায় আরো উত্তাল হয়ে ওঠে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি।

এদিকে, ‘বাহ্যিক সামরিক হুমকি’ মোকাবিলায় বেলারুশকে নিরাপত্তা সহায়তা দিতে রাশিয়া সম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট অ্যালেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কো। দেশটিতে গত কয়েকদিনের টানা রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্যে প্রতিবেশি পোল্যান্ড এবং লিথুয়ানিয়ায় ন্যাটোর সামরিক মহড়া ঘিরে উদ্বেগ দেখা দেওয়ার পর বেলারুশের প্রেসিডেন্ট এই তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, পুতিনের সরকার তাকে সহায়তা করবে। পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি আরো বলেছেন, চাপের মুখে পদত্যাগ করলে বেলারুশ শেষ হয়ে যাবে। তিনি দেশবাসীকে তার সঙ্গে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

আগের দিন শনিবারও দেশটির রাজধানীতে সরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের প্রধান কার্যালয়ের সামনে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করে। এ সময় বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্টবিরোধী বিক্ষোভ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেলে সম্পূর্ণ প্রচারের দাবি জানান। গত সপ্তাহের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন বলে দাবি করার পর বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তবে এই নির্বাচনে ব্যাপক ভোট কারচুপির মাধ্যমে লুকাশেঙ্কোর জয় নিশ্চিত করা হয়েছে বলে বিরোধীরা দাবি করেছেন। বিক্ষোভকারীরা দবি করেছেন, আগামীতে সরকারি কর্মচারিরাও তাদের সঙ্গে যোগ দিবেন।

বেলারুশের নির্বাচন কমিশন বলেছে, প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কো ৮০ দশমিক ১ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। আর তার প্রধান প্রতিপক্ষ তিখানোভস্কায়া পেয়েছেন ১০ দশমিক ১২ শতাংশ ভোট। তিখানোভস্কায়া বলছেন, ভোট সুষ্ঠুভাবে গণনা করা হলে তিনি ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হতেন। তাই এই নির্বাচন বাতিল করতে হবে।

নেতানিয়াহুর পদত্যাগের দাবিতে ইসরাইলে বিক্ষোভ

অন্যদিকে, সরকারবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ইসরাইল। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর পদত্যাগের দাবিতে শনিবার থেকে জেরুজালেমে তার বাসভবনের সামনে জড়ো হন হাজার হাজার মানুষ। জেরুজালেমে নেতানিয়াহুর সরকারি বাসভবনের সামনে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হতে শুরু করে। ধীরে ধীরে এ বিক্ষোভ জনসমুদ্রে রূপ নেয়। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে চারপাশ।

প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে করোনা মোকাবিলায় ব্যর্থতা, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে এই বিক্ষোভ শুরু হয়েছে।  এর আগেও তার পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে। তবে এবার জোর বিক্ষোভ শুরু হয়েছে, যা গতকাল ব্যাপক আকার ধারণ করে। নেতানিয়াহুকে একজন ‘ক্রাইম মিনিস্টার’ বা ‘অপরাধী’ আখ্যা দিয়ে তার শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন বিক্ষোভকারীরা। নেতানিয়াহুর বাসভবনের বাইরে ছাড়াও জেরুজালেমের বিভিন্ন সড়কে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভকারীরা। তারা প্রেসিডেন্ট রুভেন রিভলিনের বাসভবনের দিকেও যাওয়ার চেষ্টা করে। তবে সেদিকে এগিয়ে গেলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়।

এক বিক্ষোভকারী বলেন, ইসরাইলের ভবিষ্যত্ রক্ষায় আমি এ আন্দোলনে অংশ নিয়েছে। চারদিকে শুধু দুর্নীতি আর দুর্নীতি। ইসরাইলে প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ বেকার হয়ে পড়ছেন। হাতে কোনো কাজ নেই, পকেটে অর্থ নেই। কীভাবে কী করব বুঝতে পারছি না। তাই বাধ্য হয়েই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি। নেতানিয়াহু একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তিনি একজন দুর্নীতিবাজ। একজন ‘স্বৈরাচারী’ শাসক। উল্লেখ্য, দুই দফা নির্বাচনেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় চলতি বছরের মে মাসে সমঝোতার ভিত্তিতে পঞ্চম বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন নেতানিয়াহু। সূত্র : বিবিসি, সিএনএন, টাইমস অব ইসরাইল ও আল-জাজিরা