প্রশিক্ষণের সাতকাহন :প্রয়োজনীয়তা

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২০, ২১:৫৫

প্রশিক্ষণের অপরিহার্যতা সর্বজনীন এবং দেশ-কাল-পাত্রভেদে স্বীকৃত। বহির্বিশ্বে, এমনকি এশিয়ার অনেক দেশে প্রশিক্ষণের বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়, দেওয়া হয় যথোপযুক্ত মানমর্যাদা। উন্নয়নের জন্য ভিশন দরকার, দরকার যথাযথ পরিকল্পনা আর তার বাস্তবায়ন। সবগুলোই অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে যে জ্ঞান, দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও আগ্রহ থাকা দরকার, তার জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণ। নতুন কৌশল জানা, পুরোনো কৌশলকে আধুনিক বা যুগোপযোগী করা, তার প্রায়োগিক দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই। সরকার তাই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রশিক্ষণ একটি অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। প্রতিষ্ঠানের সব কর্ম যেহেতু সুনির্দিষ্ট আইনকানুন ও বিধিবিধান মেনে করতে হয়, তাই সেগুলো সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। মানুষের সেবার মনোভাব তৈরি করতেও প্রশিক্ষণ সহায়তা করে। সে বিষয়টি অনুধাবন করেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।

কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পদোন্নতি বা বদলির কারণে ধাপে ধাপে দায়িত্বের প্রকৃতি ও কলেবর পালটায়। নতুন দায়িত্ব সুচারুরূপে পালনের জন্য প্রশিক্ষণ দরকার। কর্ম সম্পাদন বৃদ্ধি, গুণগত মানোন্নয়ন, সময়-ব্যয়-সাশ্রয় এবং ভিশন-মিশন অর্জনের গতি ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই—এ কথা অনস্বীকার্য। কর্মতত্পরতার গতিবৃদ্ধি কিংবা উচ্চাকাঙ্ক্ষা অর্জনের পথে ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে গতির সঙ্গে নির্ভুলতার প্রয়োজন বেশি হয়ে পড়ে। বলা হয় Speed and accuracy wins the race আর এ ধরনের নির্ভুলতার নিশ্চয়তা প্রদান করা সম্ভব তাদের দ্বারাই, যারা সময়োপযোগী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়সমূহের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক নির্ণয় ও অনুধাবন করা এবং সে অনুয়ায়ী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সহায়তা করার জন্য অনুঘটক হিসেবে কাজ করার জন্য প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা কোনো সময়, কাল বা অবস্থানের সীমারেখায় আবদ্ধ করা যায় না। শিক্ষাজীবনে, শিক্ষাজীবনান্তে, চাকরির প্রস্তুতিকালে বা চাকরিকালীন সর্বদাই প্রয়োজন রয়েছে প্রশিক্ষণের। চাকরিজীবনের শুরুতে এর প্রয়োজন অত্যধিক। নিজের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতাপ্রসূত জ্ঞান ও যোগ্যতাকে ব্যাবহারিক করে গড়ে তোলা, প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা এবং অনাগত পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত করে তোলার জন্য এ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। বাস্তব অবস্থার নিরীখে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একাডেমিক বিষয় তথা পঠিত বা অধ্যয়ন করা বিষয়ের সঙ্গে চাকরির বিষয়ের কোনো যোগসূত্র বা সামঞ্জস্য থাকে না। সেক্ষেত্রে চাকরিতে সফলতার পূর্বশর্ত হচ্ছে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে প্রস্তুত হওয়া।

প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভুলভ্রান্তি বা অজ্ঞতা দূর করে ঝুঁকিশূন্য কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যায়। বিশেষজ্ঞগণ তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যক্ত করেন যে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের মধ্যকার পারস্পরিক বোঝাপড়া, সংহতি বা যোগাযোগ কর্মপরিবেশ উন্নত করে, মতামত আদান-প্রদানের সুযোগ বৃদ্ধি করে। বিশেষ কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের ভিশন, মিশন বা নিয়মকানুন প্রচলিত সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় না থাকায় তা রপ্ত করার একটি ব্যবস্থা অনস্বীকার্য হয়ে পড়ে। কর্মচারীদের মানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও উত্কর্ষতার ইতিবাচক পরিবর্তন হলে তদারকি, পরিবীক্ষণ বা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের (Regulatory) আবশ্যকতা হ্রাস পায়।

শিক্ষা জ্ঞানের মজুত বাড়ায় সন্দেহ নেই। তবে দক্ষতা এবং বিশেষ করে মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। দৃষ্টিভঙ্গি, যা কর্মের মূল চালিকাশক্তি বা বলা যায় পূর্বশর্ত, তা একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি সাধনা ও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবর্তন হয়। মনোবিদগণ বলেন, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ওপরই কোনো কর্মকাণ্ডের সফলতা অনেকাংশে নির্ভরশীল। অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও উত্কর্ষতার যথাযথ প্রয়োগ তখনই সম্ভব, যখন দৃষ্টিভঙ্গি সহায়ক হয়। যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো অসম্ভব—এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

ভিশন ২০২১, ২০৪১ বাস্তবায়নে এবং এসডিজি ২০৩০-এর অভীষ্টসমূহ অর্জনে দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন। ভিশন ২০২১, ২০৪১ ও এসডিজি বাস্তবায়নে যারা কাজ করছেন, তাদের এ বিষয়গুলোতে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকা দরকার। এসব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য নেটওয়ার্কিং, অভিজ্ঞতা ও মতবিনিময়, দলভিত্তিক প্রচেষ্টা সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে। অভীষ্টসমূহ বাস্তবায়নে যারা কাজ করবে, তাদের জনগণকে অনুপ্রাণিত করার কৌশল ও দক্ষতা রপ্ত করা প্রয়োজন। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, ট্রেনিং লক্ষ্যমাত্রাসমূহ বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ।

আগামী ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করার ভিশন রয়েছে সরকারের। এ লক্ষ্য অর্জনে আগামী প্রায় ২১ বছরের একটা দীর্ঘ সময় ধরে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা যায়, অন্তত ১৫ বছর যাবত্ ফি বছর ডাবল ডিজিটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। পরিকল্পনা কমিশনের জিইডির প্রাথমিক প্রাক্কলন থেকে দেখা যায়, ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জনের ক্ষেত্রে ২০২১ নাগাদ শতকরা ৮ দশমিক ১ শতাংশ হারে এবং ২০৩০ সাল নাগাদ ৯ দশমিক শূন্য শতাংশ হারে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে, আর ২০৩০ সাল নাগাদ মাথাপিছু আয় ৫ হাজার ২৫২ মার্কিন ডলারে উন্নীত করতে হবে।

উন্নত দেশে পরিণত হতে হলে মাথাপিছু জিএনআই ১২ হাজার ৭৪৫ মার্কিন ডলারে উন্নীত করতে হবে, যেখানে ২০১৮-১৯ সালে ছিল ১৯০৯ মার্কিন ডলার। ক্লাসিক্যাল মতবাদ হচ্ছে, নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ (এলডিসি-১০৪৬ মার্কিন ডলার থেকে ৪১৩৬ মার্কিন ডলার) থেকে উন্নত দেশে (মাথাপিছু আয় ১২ হাজার ৭৪৫ মার্কিন ডলারের বেশি) পরিণত হতে সাধারণত ৫৫ থেকে ৬৫ বছর সময়ের প্রয়োজন হয়। তাদের মতবাদ অনুযায়ী ২০১৫ সালে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত হতে ২০৮০ সাল নাগাদ অপেক্ষা করতে হবে।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জন প্রেক্ষাপটে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) যে প্রক্ষেপণ করেছে, তাতে দেখা যায় দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২১ সালে ৮ দশমিক ১ শতাংশ হারে এবং ২০৩০ সালে তা বেড়ে ৯ দশমিক শূন্য শতাংশ হারে উন্নীত হবে। ঐ প্রক্ষেপণে আরো দেখানো হয়েছে, ২০২১ সালে মাথাপিছু জাতীয় আয় ২ হাজার ১৯১ মার্কিন ডলার এবং ২০৩০ সালে তা বেড়ে ৫ হাজার ২৫২ মার্কিন ডলারে উন্নীত হবে।

লক্ষ করলে দেখা যাবে, ২০০৮-০৯ সালের বাজেটের আকার ৯৯ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা থেকে ১১ বছরে প্রায় চার গুণ বেড়ে ২০১৯-২০ সালে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৪১ সালে তা দাঁড়াবে ৪৪ লাখ কোটি টাকায়।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে এটি কেবলই সরলরৈখিক হিসাব। অর্থনীতির গতিধারা অনেক চলক, অনেক উপাদান, অনেক অনিশ্চয়তা যেমন—জলবায়ু, বৈশ্বিক বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ইত্যাদির ওপর নির্ভরশীল। তার পরও সাম্প্রতিক বছরগুলোর বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জনমিতির সুফল ও বাণিজ্য প্রবৃদ্ধির নিরিখে ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার আশা করা যায়। তবে এ জন্য সর্বাগ্রে যা দরকার তা হলো— যথাযথ পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নের জন্য একটি শিক্ষিত, প্রশিক্ষিত, সুশৃঙ্খল নিবেদিত কর্মী বাহিনী। সরকারি-বেসরকারি সর্বক্ষেত্রে এই বিশাল কর্মযজ্ঞে নিবেদিত ও বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত কর্মী বাহিনী ছাড়া অন্য সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে শুরু করে তা বাস্তবায়ন—সব ক্ষেত্রেই তাই সর্বাগ্রে প্রয়োজন যথাযথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণব্যবস্থা জোরদারকরণ। (চলবে)

n লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সচিব