অণুগল্প

কুতু কোথায় গেল?

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২০, ২১:২৫

মাহবুবা হক কুমকুম

 

রুমকি সকালে নাস্তা খেতে এসে কুতুকে দেখতে না পেয়ে টেবিলের নিচে উঁকি দেয়। কুতু মাঝে মাঝে টেবিলের নিচে ঢুকে বসে থাকে। আর রুমকি ওকে দেখেনি এমন একটা ভাব করতে করতে ডাকে। কুতু ডাক শুনে একটুও দেরি করে না। ছোট্ট লেজটা নাড়াতে নাড়াতে বেরিয়ে আসে। কিন্তু আজ টেবিলের নিচে কুতু নেই। মাকে জিজ্ঞেস করে, মা, কুতু কই?

মা বলে, বাগানে হয়তো। দেখে আসি।

রুমকি কুতুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। মা এসে বলল, কুতু বাগানে নেই। মা ছাদ খুঁজে এলো। ছাদেও নেই। মা এবার পাশের বাসার আন্টিকে ফোন দিল। কুতু সেখানেও যায়নি। রুমকির বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করছে। হঠাত্ মনে হলো কুতু কার্নিশে পড়ে যায়নি তো? একবার ও পড়ে গিয়েছিল কার্নিশে। মা আর বাবা মিলে কুতুকে ওঠানোর চেষ্টা করেছিল। মা দড়ির সঙ্গে একটা ব্যাগ বেঁধে কার্নিশে ফেলেছিল। কিন্তু কুতু ব্যাগে না ঢুকে ব্যাগটা অনেকক্ষণ ধরে ঘুরে ঘুরে দেখে, শুঁকে তারপর মুখ ভার করে কার্নিশের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসেছিল। শেষে ফায়ার সার্ভিস এসে বহু কসরত করে ওকে নামায়। রুমকি ভাবে, সেরকম হয়নি তো?

রুমকি তড়িঘড়ি বারান্দায় ছুটে আসে। নিচে উঁকি দিয়ে দেখে কার্নিশ ফাঁকা। কুতু কোথায় গেল। কোথায় যেতে পারে ও? কুতু কি হারিয়ে গেল? রুমকি কান্না শুরু করে দেয়।

কুতুকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। বাড়িতে না, পাশের বাড়িতে না, রাস্তায় না; কোথাও না। বাবা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়ার জন্য বেরিয়ে গেল। দুপুরের দিকে বাবা ফিরল। মাকে বলল, কাল সবক’টা পত্রিকায় বিজ্ঞাপনটা বেরুবে। মার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। বাবা বলল, চলো, একবার থানা ঘুরে আসি। মা বলে, রুমকিকেও নিয়ে যাই।

তিনজন থানায় এলো। ডিউটি অফিসার জিজ্ঞেস করলেন, নাম? রুমকি বলল, ঝুমকি রহমান কুতু। গায়ের রং? রুমকি বলে, সাদা। অফিসার লেখেন, ফরশা। এবার জিজ্ঞেস করেন, বয়স? মা বলে, ৩ বছর। লিখতে লিখতেই অফিসার জিজ্ঞেস করেন, সম্পর্ক? রুমকি উত্তর দেয়, আমার ছোটবোন। হারানোর সময় পরনে কী ছিল? রুমকি বলে, হলুদ কলারের লাল জামা আর গলায় লাল মালা। অফিসার ছবি চান। বাবা অফিসারের হাতে কুতুর ছবি দেয়। অফিসার ছবি দেখে লাফিয়ে ওঠেন, কুকুর! কুকুর আপনার মেয়ে!! বাবা বলেন, হ্যাঁ মেয়ের মতোই। আমাদের ফ্যামিলি মেম্বার। অফিসার ভুরু কুঁচকে বললেন, ঠিক আছে আপনারা যান। খোঁজ পেলে জানাব।

ওরা বাড়ি ফিরে এলো। রুমকি মন খারাপ করে বারান্দায় বসে আছে। হঠাত্ মায়ের চেঁচামেচি শুনতে পেল। রুমকি ছুটে যায় মায়ের ঘরের দিকে। দরজায় দাঁড়িয়ে রুমকি পাথর হয়ে গেল। একি দেখছে ও! মায়ের কোলে কুতু! কুতুও রুমকিকে দেখে ফেলেছে। কুতু হাঁচড়পাঁচড় করে মায়ের কোল থেকে নেমে একলাফে রুমকির কোলে। রুমকির মুখ ভিজে গেল কুতুর চাটাচাটিতে। এত জোরে জোরে লেজ নাড়াচ্ছে কুতু যে মনে হচ্ছে এক্ষুনি লেজটা খসে পড়বে। কুতু সমানে কথা বলে যাচ্ছে ভুকভুক করে আর রুমকি সমানে জিজ্ঞেস করে যাচ্ছে, কই ছিলি তুই? কোথায়  গিয়েছিলি? কেউ কারো কথা শুনছে না।

কিছুক্ষণ পরে মা ঘটনা বলল। সকালে কোনো এক ফাঁকে কুতু হয়তো আলমিরা খোলা পেয়ে ভেতরে ঢুকে বসেছিল। মা এদিকে আলমিরার দরজা বন্ধ করে দিয়েছে আর কুতু আটকা পড়ে গেছে। এখন আলমিরা খুলতেই কুতু হুড়মুড় করে বেরিয়ে আসে।

রাতে রুমকি কুতুর কানে কানে বলে, বাবাকে কাল বলবি, তোকে যেন চারটা নূপুর কিনে দেয়। কুতু জুলজুল করে রুমকির মুখের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলে, ভোউ। তারপর দু’জন দু’জনকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে।