প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের বড় ঝুঁকিতে রাজধানী। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার ৯ শতাংশ মানুষ করোনায় আক্রান্ত। এর মধ্যে আবার ৭৮ শতাংশই উপসর্গহীন। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) করা সম্প্রতি এক জরিপে এ চিত্র উঠে এসেছে। অর্থাত্ রাজধানীতে ২ কোটি মানুষের বসবাস হলে ১৮ লাখ মানুষ করোনায় আক্রান্ত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, জনচলাচল বেশি থাকায় রাজধানীতে সংক্রমণ বাড়ছে। মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দেন তিনি।
করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে দেশে প্রতিদিন গড়ে ৩০ জনেরও বেশি মানুষ মারা যাচ্ছেন। নতুন শনাক্তের সংখ্যাও গড়ে প্রায় ৩ হাজার। আক্রান্ত ৭৮ ভাগ মানুষের কোনো উপসর্গ নেই। বিশেষ করে ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সিরা বেশি উপসর্গহীন থাকছেন। তারাই ভাইরাসটি বেশি ছড়াচ্ছেন। স্বাস্থ্যবিধি অনেকেই মানছেন না। প্রতিদিন ঢাকার আশপাশ ও বিভিন্ন এলাকা থেকে ৩০ লাখ মানুষ রাজধানীতে আসাযাওয়া করেন। অর্থনীতি বিবেচনায় দোকানপাট, অফিস, আদালত খুলে দেওয়া হয়েছে। সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘করোনার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে দেশ। পুরোপুরি নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকিমুক্ত বলা যাবে না। পরীক্ষার হার কম থাকায় শনাক্ত কম হচ্ছে।’ বিশেষজ্ঞরা সতর্কবাণী দিলেও কিছু কিছু মহল বলছে, করোনা যাই যাই ভাব। ভ্যাকসিন আসুক বা না আসুক কোভিড-১৯ বাংলাদেশ থেকে এমনিতেই চলে যাবে। বাংলাদেশের বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতেও কিছু মহলের এমন বক্তব্যের যথার্থতা কতটুকু, এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে কি না, এমন নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, পৃথিবীর যেকোনো দেশেই করোনা কমবেশি আক্রমণ করে চলেছে। আমাদের দেশে হয়তো বলতে পারেন, অন্য দেশের বিচারে তুলনামূলক কম। কিন্তু এখানে আত্মতৃপ্তি বা আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ আমরা দেখি না। তৃপ্তির ঢেকুর তোলার কোনো সুযোগ তো নেই। করোনা কবে যাবে, কেউ তো নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারছে না। হয়তো অন্য অনেক ভাইরাসের মতো করোনাও সারা জীবনই রয়ে যাবে। সুতরাং এর সংক্রমণ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় ভ্যাকসিন। এখন পর্যন্ত গবেষণায় তো এটাই পাওয়া গেছে।
করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সভাপতি ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশ এখনো করোনার চরম ঝুঁকিতে আছে। বিপদ কেটে যায়নি। একজন রোগী থাকলেও ঝুঁকি থাকে। চীনের উহান শহরে করোনা রোগী কমে এলেও আবার সেখানে বেড়েছে। তাই বিপদ কেটে গেছে এটা বলা যাবে না। রাজধানী ঢাকায় করোনার ঝুঁকি বেশি উল্লেখ করে অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ বলেন, রাজধানীতে মানুষের মধ্যে ৯ ভাগ করোনায় আক্রান্ত। অর্থাত্ ১৮ লাখ করোনায় আক্রান্ত। এর মধ্যে ১ লাখ ৮০ হাজার রোগী হাসপাতালে গেছেন। বর্তমানে হাসপাতালে করোনা রোগীরা কম যাচ্ছে, অন্য রোগীরা বেশি যাচ্ছে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই। সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। তিন ঘণ্টায় করোনার পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করতে টেকনিক্যাল কমিটি সরকারকে প্রস্তাব দেবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশ এখনো করোনা ঝুঁকিমুক্ত হয়নি। পরীক্ষা অল্প হচ্ছে বলে শনাক্ত কম হচ্ছে। আমরা ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছি। এখন থেকে আগামী অক্টোবর পর্যন্ত যদি প্রতিদিনই কমতেই থাকে, তাহলে বলা যাবে করোনা কোন দিকে যাচ্ছে। জীবন বাঁচাতে এখন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে, বিশেষ করে মাস্ক পরতে হবে, হাত ধুতে হবে।
নিপসনের সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুর রহমান বলেন, এখনো করোনার ঝুঁকির মধ্যে আছি, কোনো পরিবর্তন হয়নি। দুই-একদিন কমলেও এটা ঝুঁকিমুক্ত বলা যাবে না। ব্যাপক হারে পরীক্ষা করা হলে আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়বে। তিনি বলেন, যতক্ষণ ভ্যাকসিন না আসবে ততক্ষণ ঝুঁকিমুক্ত বলার সুযোগ নেই। আক্রান্ত ৭০ ভাগ মানুষ উপসর্গহীন। অনেকের হাসপাতালে যাওয়া লাগে না। এমনিতেই সুস্থ হয়ে যান। ডা. আব্দুর রহমান বলেন, সবার স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, মানতে বাধ্য করতে হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রোভিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন বলেন, আমরা প্রচণ্ড করোনা ঝুঁকির মধ্যে আছি। ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত এবং সবার তা পাওয়া নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকিমুক্ত বলা যাবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন বলেন, ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সিরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এবং তারা বেশি মানুষকে সংক্রমিত করছে। বাংলাদেশেও এই অবস্থা বিরাজ করছে। তাই যেকোনো মূহূর্তে করোনা ভাইরাসের ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেন, আমরা সচেতনতা বাড়ানোর জন্য কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। স্বাস্থ্যবিধি মানছে কি না, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। ইতিমধ্যে সরকার মাস্ক ব্যবহার না করলে জেল-জরিমানার বিধান করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো, এটি কার্যকরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তেমন তত্পরতা দেখা যাচ্ছে না।
