পরিসংখ্যানে কেন আস্থা কমিতেছে?

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২০, ২১:৫৬

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য-উপাত্ত যেন বিশ্বাসযোগ্যতায় পিছাইয়া পড়িতেছে। বিবিএসের ওয়েবসাইটে গিয়া দেখা যায়, তথ্য সংগ্রহের লক্ষ্যে সাইটটিতে এখন পর্যন্ত ৫৯ লক্ষ ভিউ হইয়াছে। অর্থাত্ মানুষ তথ্য জানিতে চাহে। কিন্তু প্রয়োজনীয় তথ্য মিলে কি? বিবিএসের কার্যক্রম কতটা দক্ষতার সহিত চলিতেছে, তাহার কিছু উদাহরণ দেওয়া যাইতে পারে। যেমন গত তিন বত্সরে দেশের শ্রমশক্তির নূতন কোনো জরিপ করিতে পারে নাই সংস্থাটি। ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে শ্রমশক্তি জরিপ অব্যাহত থাকিলে গত এপ্রিল হইতে জুন অবধি করোনার কারণে কত মানুষ বেকার হইয়াছেন, তাহা জানা যাইত। অর্থনীতির গতিধারা অনুধাবন করিতে পার্শ্ববর্তী ভারতও তিন মাস পরপর জিডিপি গণনা করিয়া থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলিতেও প্রান্তিকভিত্তিক জিডিপি গণনা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে বত্সরে একবার জিডিপি গণনা করা হয়। ফলে অর্থবত্সরের শেষ প্রান্তিকে অর্থনীতিতে করোনার ধাক্কা লাগিলেও তাহার প্রকৃত চিত্র উঠিয়া আসিতেছে না। বিবিএসের সাময়িক হিসাব বলিতেছে, গত ২০১৯-২০ অর্থবত্সরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হইয়াছে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ। কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করিতেছেন, করোনার ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র জিডিপির হিসাবে আসে নাই।

পরিসংখ্যানের গুরুত্ব অতি প্রাচীন। উপমহাদেশের অংশ হিসাবে বাংলা নামক ভূখণ্ডে পরিসংখ্যানশাস্ত্রের চর্চার ইতিহাস প্রায় সোয়া ২ হাজার বত্সরের পুরাতন। ইতিহাস হইতে জানা যায়, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের (খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৪-৩০০) শাসনামলে এই অঞ্চলে সরকারি ও প্রশাসনিক কাজকর্মের প্রয়োজনে পরিসংখ্যানগত তথ্য সংগ্রহের একটি দক্ষতাপূর্ণ ব্যবস্থা গড়িয়া উঠিয়াছিল। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র হইতেও জানা যায়, বাংলায় খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ অব্দেও জৈব পরিসংখ্যানগত তথ্য সংগ্রহ এবং জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধীকরণের সুষ্ঠু ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। ব্রিটিশ ভারতে পরিসংখ্যান আরো বিজ্ঞানভিত্তিক রূপ লাভ করে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাসংগ্রামের পর বাংলাদেশে সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য ১৯৭৪ সালে চারটি পরিসংখ্যান অফিস একীভূত করিয়া সৃষ্টি করা হয় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। কিন্তু দিনদিন ইহার গ্রহণযোগ্যতা ক্রমশ হ্রাস পাইতেছে বলিয়া ওয়াকিবহাল মহল মনে করিতেছে। এই জন্য পরিকল্পনা করিতে গিয়া তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি সবচাইতে অধিক ভোগায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিবিএসের নিকট হইতে তিন-চার বত্সরের পুরাতন তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়। অথচ পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় পরিস্থিতি বদলাইয়া যায়। অভিযোগ রহিয়াছে, নীতিনির্ধারকদের মধ্যে হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত পাইবার তাগিদ নাই। জেলা পর্যায়ের অফিসে রাজস্ব বেতনভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যেইভাবে কাজে লাগানো সম্ভব, তাহা করা হয় না। বিশ্বব্যাংকের বিবেচনায় মূলত তথ্যের উত্স দুর্বলতা, মেথডোলজিক্যাল দুর্বলতা বা মাননির্ধারণে দুর্বলতা, নির্ভুলতা ও নির্দিষ্ট সময়ে প্রকাশ করিতে না পারার কারণেই ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের তথ্যের মান দুর্বল হইতেছে। অথচ স্বাধীনতা-উত্তরকাল হইতেই বিবিএস জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখিয়া নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান প্রণয়ন ও প্রকাশ করিয়াছে।

পরিকল্পনা প্রণয়ন ও ব্যবহারকারীদের উত্তরোত্তর চাহিদা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে বিবিএসকে আধুনিকায়ন ও অধিকতর শক্তিশালী করিবার তাগিদ অনুভব করা হইলেও তাহা বাস্তবতা হইতে দূরে সরিয়া যাইতেছে। প্রকৃত উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য সত্বর বিবিএসের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি।