পৃথিবীতে অনেক স্থাপত্যশিল্প রহিয়াছে যাহা যুগ যুগ ধরিয়া সৌন্দর্যপিপাসু ও শিল্পবোদ্ধাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া আসিতেছে। তুরস্কের সুলায়মানিয়া মসজিদ, আবুধাবির গ্রান্ড মসজিদ, স্পেনের আল হাম্বরা মসজিদ প্রভৃতি মুসলিম স্থাপত্যশিল্প একবার দেখিলে মন ভরে না, বারংবার দেখিতে ইচ্ছা করে। স্থাপত্যশৈলী বাইজেন্টাইন, ইরানীয়, ভারতীয় ও চৈনিক স্থাপত্যশিল্পে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করিয়াছে। এই শিল্পের ধরনগুলির মধ্যে রহিয়াছে ধর্মীয় প্রার্থনালয়, সমাধি, প্রাসাদ ও কেল্লা। বাংলাদেশেও এমন অসংখ্য মুসলিম ও হিন্দু স্থাপত্যকর্ম রহিয়াছে, যাহা বিদেশি পর্যটকদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে সক্ষম হইয়াছে। এই সকল নিদর্শন আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষার তাগিদেই বিশেষভাবে সংরক্ষণের দাবি রাখে।
অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হইল, বাংলাদেশে অনেক স্থাপত্য নিদর্শন আজ বিলুপ্তির পথে। এই ব্যাপারে আমাদের সচেতনতারও অভাব রহিয়াছে। গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি খবরে বলা হইয়াছে যে, রাজশাহীর বাঘায় মোগল আমলে তৈরি নারী মসজিদটির অবস্থা এখন শোচনীয়। রাজশাহী শহর হইতে ৪৯ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণ কোণে হজরত শাহ মোয়াজ্জেম ওরফে শাহদৌলার (রহ.) পুত্র হজরত শাহ আবদুল হামিদ দানিশ মন্দ (রহ.) মাজারসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত এই মসজিদটি। ইহা দেখিতে হাজার হাজার পর্যটক ও দর্শনার্থীর আগমন ঘটে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মসজিদটিকে ঐতিহাসিক নিদর্শনের তালিকাভুক্তও করিয়াছে। অথচ ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি সংস্কার করা হইতেছে না। একসময় পর্দানশিন নারীদের জন্য এই মসজিদটি তৈরি হয় বলিয়া ইহা নারী মসজিদ নামে খ্যাতি অর্জন করিয়াছে। তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদের অবস্থান প্রায় ৩০ ফুট সুউচ্চ টিলার উপরে। দৈর্ঘ্য ২৭ ফুট ও প্রস্থ ১৩ ফুট। চারপাশের দেওয়াল তিন ফুট ছয় ইঞ্চি চওড়া। মসজিদটি প্রায় ৩০০ বত্সরের পুরাতন। তাহারও প্রায় ২০০ বত্সর পূর্বে হজরত শাহদৌলা (রহ.) সুদূর বাগদাদ হইতে এখানে আসিয়া বসবাস শুরু করেন। তাহার অনেক অলৌকিক কীর্তি দেখিয়া বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন বলিয়া জানা যায়। হজরত শাহদৌলার (রহ.) স্মৃতিবিজড়িত এলাকায় তৈরি মোগল আমলের এই মসজিদটি আদি নকশা অক্ষুণ্ন রাখিয়া দ্রুত সংস্কার করা একান্ত প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ওলি-আউলিয়ার দেশ। এখানে মুসলিমবান্ধব পর্যটনশিল্প বিকাশের অনুকূল পরিবেশ রহিয়াছে। দেশে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর নির্মিত প্রায় দেড় হাজার ঐতিহ্যপূর্ণ দর্শনীয় স্থান রহিয়াছে, যাহা দৃষ্টিনন্দন করিয়া তুলিতে পারিলে আগামী পাঁচ বত্সরে এইরূপ পর্যটন খাত হইতে ২ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। গত বত্সর ওআইসি ঢাকাকে পর্যটননগরী হিসাবে ঘোষণা করিয়াছে। তাহারও পূর্বে ২০১২ সালে ঢাকাকে ইসলামি সংস্কৃতির এশীয় অঞ্চলের রাজধানী হিসাবে ঘোষণা করা হয়; কিন্তু আমরা কি ইহার সদ্ব্যবহার করিতে পারিতেছি? ঢাকার বাহিরেও অবস্থিত স্থাপত্যকেন্দ্রগুলি সংরক্ষণে মনোনিবেশ করিয়াছি? নারী মসজিদের বেহাল দেখিয়া স্পষ্টত বোঝা যায়, আমরা আমাদের কর্তব্য পালনে এবং ঐতিহ্য রক্ষায় আন্তরিকতার পরিচয় দিতে পারি নাই।
