ড. আবদুল লতিফ মাসুম
আফগানিস্তান ছিল চিরস্বাধীন। সাম্প্রতিক যুগে শক্তিমদমত্তরা যখন গায়ের জোরে মুলুকের পর মুলুকের দখল করছিল তখন তিন কারণে আফগান জনগণ নিজেদের স্বাধীনতা সংরক্ষণে সক্ষম হয়েছিল। প্রথমত, আফগান যোদ্ধা জাতির অদম্য সাহস ও দৃঢ়তা; দ্বিতীয়ত, দুর্গম পার্বত্য অবস্থান এবং তৃতীয়ত, অবশেষে দুই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মধ্যবর্তী অবস্থান। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান এর নাম দিয়েছে ‘বাফার স্টেট’ বা মধ্যবর্তী রাষ্ট্র। আফগান জেহাদের অনিবার্য অংশীদার হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন অস্ত্র, অর্থ এবং পাকিস্তানের শক্তি সব মিলে জয়লাভ করল আফগান তালেবানরা। মার্কিনিরা গণতন্ত্র গিলাতে চাইলেও আফগান পেটে তা হজম হওয়ার নয়। সেখানে ইসলামি মৌলবাদীদের উত্থানে বিব্রত হয় আমেরিকা। মিত্র শত্রু হয়ে দাঁড়ায়, যখন সেখানে আশ্রয় পায় ৯/১১-এর সর্বাধিক সন্দেহভাজন ওসামা বিন লাদেন। আফগান ‘জেহাদ’-এর বিপরীতে বুশ সিনিয়র ঘোষণা করেন ‘ক্রুসেড’। (শব্দটি একবারই তিনি ব্যবহার করেন।)
২০০১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করে। তালেবানদের সামরিকভাবে উচ্ছেদ করা সম্ভব হলেও আদর্শিকভাবে উচ্ছেদ করা সম্ভব নয়। বিরাট জনগোষ্ঠী রয়েছে তাদের সমর্থনে। পরাজিত হওয়ার পর প্রত্যন্ত তৃণমূলে চলে যায় তারা। আত্মগোপন অবস্থায় তালেবান নেতা মোল্লা ওমরসহ অসংখ্য নেতাকর্মী ড্রোন হামলায় নিহত হয়। এর পরও ধীরে ধীরে সংগঠিত হয়ে তারা মার্কিন প্রতিস্থাপিত ‘কাবুল সরকারকে কোণঠাসা করে দেয়। দেশের অধিকাংশ অংশ চলে যায় তালেবান আওতায়। মার্কিন বাহিনী অব্যাহত আক্রমণের শিকার হয়। অবস্থা এ রকম হয়ে দাঁড়ায় ‘মার্কিনিরা কম্বল ছাড়লেও কম্বল মার্কিনিদের ছাড়ে না’। অনেকের আশঙ্কা তারা চলে গেলেই কাবুলে ফিরে আসবে তালেবান সরকার। অসংখ্য গোত্র আর স্বার্থে বিভক্ত আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা অর্জন সহজ নয়। মার্কিনিরা রাজনৈতিক সমাধান চায়। ভিয়েতনামের মতো সসম্মানে প্রস্থান করতে চায়। তালেবানদের উত্পীড়নে নাজেহাল তারা। ২০১৯ সালে তারা তালেবানদের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু করে। এতে আবার কাবুলে প্রতিস্থাপিত মার্কিন সমর্থিত সরকার রাজি নয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একজন শান্তিদূত নিয়োগ করে। তার নাম লাখদার ইব্রাহিমি। তিনি আফগান বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। তিনি ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আলোচনা শুরু করেন। গোপনে ও প্রকাশ্যে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে, দেশ-বিদেশে এ আলোচনা চলতে থাকে। মার্কিনিদের প্রতিনিধিত্ব প্রকাশ্য ও নিয়মানুগ ছিল। অন্যদিকে তালেবানরা যেহেতু একটি যোদ্ধা দল, তাদের প্রতিনিধিত্ব ও প্রক্রিয়া একটু কঠিন ছিল। বারবার প্রতিনিধিত্ব বদল করতে হয়। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী প্রতিনিধিদলের নেতা নির্বাচিত হয়েছেন মোল্লা ওমরের ছেলে। সবার আশা, তার প্রতিনিধিত্ব ব্যাপক সমর্থন লাভ করবে। যাহোক, এর আগেই কষ্টকর প্রসববেদনা অবশেষে শান্তিচুক্তিটি ভূমিষ্ঠ হয় ২০২০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি। দোহায় চুক্তিটি কাতার সরকারের আতিথেয়তায় স্বাক্ষরিত হয়। অনিশ্চয়তা ছিল উভয় পক্ষের। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অস্থিরতা নিয়ে ভয় ছিল। তালেবানদের বিভিন্ন গ্রুপের সমন্বয় সহজ ছিল না। চুক্তিটি স্বাক্ষরের পরপরই কাবুলে হামলা হয়। ট্রাম্প স্থগিত করেন চুক্তি। ‘টাইম ইজ দ্য বেস্ট হিলার’। কয়েক মাস পরে চুক্তিটি কার্যকরের চেষ্টা করা হয়। স্বাক্ষরিত চুক্তির স্বার্থ মোতাবেক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ক্রমশ সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করে নেবে। বিনিময়ে তালেবানরা তাদের সশস্ত্র কার্যক্রম বন্ধ করবে। মার্কিন বা মার্কিন-সমর্থিত সরকারকে আঘাত করবে না তালেবানরা। শান্তি স্থাপনের পক্ষে সন্দেহ নেই এটা একটি প্রাথমিক বিজয়। শান্তিচুক্তিটির বড় দুর্বলতা হচ্ছে, এতে রাজনৈতিক সমাধানের দীর্ঘ প্রক্রিয়া সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি। সম্ভবত নির্বাচনের মতো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন সেখানে সম্ভব নয়। সাধারণত এ ধরনের চুক্তিতে রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার বিষয় থাকে। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, দীর্ঘ ২০ বছরে মার্কিনিরা সেনা প্রত্যাহারের মতো পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি। তাদের এখন ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা। গত মার্চ থেকে তারা সেনা প্রত্যাহার শুরু করেছে। তালেবানরা আক্রমণ চালিয়েই যাচ্ছে। মার্কিনিরা কাকের মতো চোখ বুজে আছে। যেন তারা দেখছে না কিছুই। ডিসেম্বর পর্যন্ত সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার না হলেও অধিকাংশই প্রত্যাহার হবে বলে কূটনৈতিকরা মনে করেন। ট্রাম্পের ঘোষিত নীতি অনুযায়ী তারা আর ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করবে না শিখণ্ডী সরকারের স্বার্থে। এখন কাবুল সরকারের নাজুক অবস্থা। আশরাফ ঘানির সরকার না পারছে মার্কিনিদের ধরে রাখতে অথবা তালেবানদের গ্রহণ করতে। এটা মোটামুটি নিশ্চিত যে, ডিসেম্বর বা আগামী বছরের প্রথমদিকে মার্কিন সেনাবাহিনী ছেড়ে যাবে আফগানিস্তান। বিশ্ব জুড়ে জিজ্ঞাসা, তারপর? সবারই আশঙ্কা তালেবানরা কাবুল দখলে নেবে। সেখানে রক্তপাতের আশঙ্কা অমূলক নয়। আফগানিস্তানের মতো সনাতনী সমাজে শক্তি প্রয়োগেই সমাধান খোঁজা হয়। অবশেষে কাবুল সরকার অধীনতামূলক মিত্রতা স্থাপন করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কাবুলে তালেবানরা ক্ষমতাসীন হলেই যে শান্তির সুবাতাস বয়ে যাবে—এমন আশা দুরাশা। আগেই বলেছি শত মত, শত পথ, শত গোষ্ঠীতে বিভক্ত আফগান জনগোষ্ঠী। আর অস্ত্র তো সমঝোতার কথা বলে না। রক্ত ঝরায়। প্রথমবার তালেবানদের পরাজয়ের পর নর্দার্ন অ্যালায়েন্স কাবুল দখল করে। কারজাই ছিল তাদেরই প্রতিনিধি। এবার হয়তো সাউদার্ন অ্যালায়েন্স বা এ রকম কিছু দাঁড়িয়ে যাবে। এদিকে ইরাক থেকে বিতাড়িত ইসলামি রাষ্ট্রের সৈনিকেরা আফগানিস্তানের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করছে বলে খবর আসছে। তাহলে মনে হয় শান্তি সুদূর পরাহত।
আফগানিস্তানের মতো দীর্ঘ সময়ের সংকট শুধু অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। আমরা অতীতে দেখেছি, সোভিয়েত ইউনিয়ন এসেছে বলেই মার্কিনিরা এসেছে। সেই সঙ্গে আঞ্চলিক বলয়ে ঘটেছে নানা ধরনের জটিল ও কুটিল সমীকরণ। ২০০১ সালে মার্কিন মিত্র জোটের হস্তক্ষেপের সময়ে পার্শ্ববর্তী সব রাষ্ট্রের সমর্থন আদায় করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তারা সাবেক সোভিয়েত বলয়ভুক্ত কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান ইত্যাদি রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তা নেয়। একই সঙ্গে তারা পরস্পর বৈরী ভারত ও পাকিস্তানের শক্ত সমর্থন লাভ করে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশারফ তো এক রকম আত্মসমর্পণ করেন। চির স্বাধীন আফগানিস্তান দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পরাধীনতার গ্লানি বহন করছে। কথায় বলে, ‘আপন মাংসে হরিণ বৈরী’। সে রকম আফগানিস্তানের তাত্পর্যপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান, বিপুল খনিজ সম্পদ এবং শাশ্বত আদর্শ এর সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আশার কথা এই যে, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন যেমন প্রায় এক দশক পরে হাত গুটিয়েছে, তেমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও সেনা প্রত্যাহারে বাধ্য হচ্ছে। এতে আফগান জনগণের সাহস ও শক্তিমত্তার প্রমাণ মিলছে। আফগানিস্তানের মালিক-মোখতার আফগান জনগণ। সেদেশের জনগণই নির্ধারণ করবে কে হবে তাদের ভাগ্যবিধাতা। পৃথিবীর মানুষ আফগানিস্তানকে যে কোনো পরাশক্তির হস্তক্ষেপমুক্ত দেখতে চায়। দীর্ঘজীবী হোক সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘ইনহাস্ত ওয়াতানাম’।
n লেখক :অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
