বাঁধে আসে পর্যটক বর্জ্যে ভরে হালদা

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২০, ২২:০৭

চট্টগ্রামের হালদায় নতুন সংকট পর্যটকদের সৃষ্টদূষণ। দেশে কার্পজাতীয় মাছের একমাত্র প্রজননস্থল হালদা নদী। এই নদীর মূল্যবান মা-মাছেরা এখনো ঝুঁকিমুক্ত নয়। উপজেলা প্রশাসন, হালদা রক্ষা কমিটি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরিসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সার্বক্ষণিক পাহারা ও নজরদারিতে এই নদীর সার্বিক পরিস্থিতি যখন উন্নতির দিকে, তখন নতুন করে দূষণ বিস্তারের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে নদীর ফটিকছড়ি উপজেলা অংশে পাউবো নির্মিত বেড়িবাঁধে বিপুল জনসমাগম। এখানে বেড়াতে আসা লোকজন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিকের বোতল, চিপস, কেক, চানাচুরসহ নানা ধরনের খাদ্যদ্রব্যের বর্জ্য নদীর পানিতে ফেলে দূষণ করছে। এদিকে ১৭ আগস্ট স্থানীয় সংসদ সদস্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জরুরি সভায় বেড়িবাঁধ থেকে সব ধরনের দোকানপাট উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

হালদা গবেষকেরা জানান, পাউবোর বেড়িবাঁধটি নির্মিত হওয়ার কারণে হালদাপাড়ের ঐ অংশ এখন পরিণত হয়েছে পর্যটন স্পটে। গত ঈদের ছুটিতে বিপুলসংখ্যক স্থানীয় পর্যটক ঐ বেড়িবাঁধ এলাকায় বেড়াতে আসে। প্লাস্টিকের বোতল, চিপস, চানাচুরসহ নানা ধরনের খাদ্যদ্রব্যের বর্জ্য, অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল, প্যাকেট ও অপচনশীল দ্রব্য নদীর পানিতে ফেলে মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। গবেষকেরা বলেন, এসব পদার্থ হালদা নদীর ব্রিডিং গ্রাউন্ড বা প্রজননস্থলে                 ভেসে এসে নদীর তলদেশে গিয়ে জমা হচ্ছে। পানিকে এমনই দূষিত করছে যে এই পানিতে মাছসহ জলজ প্রাণীর বিচরণ ও বেঁচে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং হালদা রক্ষা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া ইত্তেফাককে বলেন, ‘এই নতুন দূষণের কারণ বন্ধে আমরা ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইয়েদুল আরেফিনের সঙ্গে দেখা করে সমস্যাটি তুলে ধরেছি। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বিষয়টি অবহিত করেছি। কারণ হালদা নদী এবং এই নদীর মূল্যবান মা-মাছ ও জলজ প্রাণীসমূহকে বাঁচাতে এখনই এই বেড়িবাঁধ এলাকায় স্থানীয় পর্যটকদের সমাগম বন্ধ করা প্রয়োজন।’ ইউএনও মহোদয় জানিয়েছেন, তিনি স্থানটি সরেজমিনে পরিদর্শন করবেন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চলতি সপ্তাহেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ড. কিবরিয়া বলেন, এই নদী ভয়াবহ দূষণ থেকে রক্ষায় হাটহাজারীর এশিয়ান পেপার মিল ও পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট (বিদ্যুত্ উত্পাদন কেন্দ্র) বন্ধ করে রাখা হয়েছে। গত অর্ধদশকের এসব উদ্যোগের কারণে চলতি বছরের মে মাসে মা-মাছেরা নিরাপদে গত ১২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণ ডিম ছেড়েছে। জেলে ও ডিম সংগ্রহকারীরা নদী থেকে প্রায় ২৫ হাজার কেজি কার্পজাতীয় মাছের ডিম সংগ্রহ করেছেন এ বছর।

ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইয়েদুল আরেফিন ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমার কাছে অভিযোগ আসার পরপরই আমি উপজেলা চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বেড়িবাঁধ এলাকা পরিদর্শন করেছি। দূষণ বিস্তারের কারণসমূহ চিহ্নিত করেছি। ১৭ আগস্ট স্থানীয় সংসদ সদস্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় দূষণ রোধে জরুরি সিদ্ধান্ত এবং জনসাধারণের জন্য আচরণ বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। বিধিমালার মধ্যে রয়েছে—বেড়িবাঁধের ওপর থেকে খাবারের দোকানসহ সব ধরনের দোকানপাট অবিলম্বে উচ্ছেদ, বেড়িবাঁধের ওপর যানবাহন চলাচল বন্ধ, নৌকায় আরোহণকারীদের লাইফ জ্যাকেট পরিধান, মুখে মাস্ক ব্যবহার করা, বাঁধের ওপর খাবার নিয়ে কেউ আসার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রধান করে দূষণ রোধে দুটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত ও বিধিমালা আগামী সপ্তাহে সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হবে এবং তা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে।