এবারের চলমান বন্যায় ৩৩টি জেলার ৬ দশমিক ১ শতাংশ বা ৫০ লাখ ২৮ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২ আগস্ট পর্যন্ত ফসলের ক্ষতির পরিমাণ ৩৫৭ কোটি টাকা। প্রাণিসম্পদের ক্ষতির পরিমাণ ৬৩৩ কোটি টাকার বেশি। বন্যায় শোয়া লাখ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বরাদ্দের ৬৩ শতাংশ খাদ্য বিতরণ হয়েছে। নগদ অর্থ বিতরণ হয়েছে ৬৮ শতাংশ। যদি সব বরাদ্দ বিতরণ করা হয় সেক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ মাথপিছু পাবে মাত্র ১ দশমিক ৩ কেজি চাল এবং নগদ পাবে মাত্র ৫ টাকা ৭০ পয়সা। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বরাদ্দ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটি বলছে, বর্তমান বিতরণ ব্যবস্থায় মাত্র ৫৪ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদি এবারের বন্যায় পরিবারগুলোকে এক মাসে অন্তত ৪৬ কেজি চাল দেওয়া প্রয়োজন। এজন্য বাড়তি ১১ হাজার ১২৮ টন চাল এবং নগদ সহায়তা দিতে বাড়তি ১১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার সুপারিশ করেছে সিপিডি।
গতকাল বুধবার ‘সাম্প্রতিক বন্যা : ক্ষয়ক্ষতি ও করণীয়’ শীর্ষক ভার্চুয়াল সংলাপের আয়োজন করে সিপিডি। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চালনায় এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান। সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহানের সভাপতিত্বে আয়োজিত ভার্চুয়াল আলোচনায় বক্তব্য রাখেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এমিরিটাস ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান, সুনামগঞ্জের ডিসি মো. আব্দুল আহাদ প্রমুখ। সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, বন্যা শুরুর আগেই উদ্যোগ নিতে হবে। বন্যা মোকাবিলায় এডহক ভিত্তিতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। গত ২০ বছর ধরে বন্যা থেকে যা শিখেছি সেটা কি ব্যবহার করতে পেরেছি? পরিকল্পনা হচ্ছে বহুবছর ধরেই। গত ৬০ বছর ধরেই দেখছি নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দেশ স্বাধীন হবার পর ৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় এক সময় ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান হয়েছিল। এখন হয়েছে ডেল্টা প্ল্যান। উজানে থাকা দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ নদী কমিশন গঠন করা হয়েছে। কিন্তু এটি শুধু নামকাওয়াস্তে। তিনি বলেন, জীবনের ৮৫ বছর পার করলাম। জীবদ্দশায় পানি সমস্যার টেকসই সমাধান দেখে যেতে পারবেন কি না সে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
আলোচনার প্রধান অতিথি দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান বলেন, ৫০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আমরা সবাইকে ত্রাণের আওতায় নিয়ে আসব না। যাদের প্রয়োজন শুধু তাদেরই ত্রাণ দেওয়া হবে। ত্রাণের অপ্রতুলতা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে কিছু সময় বেশি লাগছে, তবে সব জায়গায় ত্রাণ যাচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের তথ্য নিয়ে প্রয়োজনের আলোকে ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ত্রাণভিত্তিক দুর্যোগ মোকাবিলার ব্যবস্থা থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে চাইছি। বন্যাসহনশীল বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন তিনি।
ড. আইনুন নিশাত বলেন, গ্রামের মানুষ বলছে আমরা ত্রাণ চাই না, টেকসই বাঁধ চাই। গত বছরও এরকম পরিস্থিতি হয়েছিল। দীর্ঘস্থায়ী বন্যা বলে যে হইচই হচ্ছে সেটি সঠিক না। প্রতিবছরই পানি এসব জায়গায় বৃদ্ধি পায়। গণমাধ্যমে যে ছবি ছাপা হয় সেগুলো চরের ছবি। চর এলাকা পানিতে ডুববে, হাওর এলাকা পানিতে ডুববে—এটা স্বাভাবিক। কোভিডের কারণে গত তিন-চার মাস সাধারণ মানুষের কাজ ছিল না, এখন পানি বৃদ্ধির ফলে তাদের কষ্ট আরো বেড়েছে। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, স্বল্প মেয়াদে সাহায্যের পরিমাণ আরো বাড়াতে হবে। কোভিডের সঙ্গে বন্যা যুক্ত হয়ে দ্বিমাত্রিক সমস্যা তৈরি হয়েছে।
