খেলাপি ঋণে হাবুডুবু খাচ্ছে রাকাব

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২০, ২২:১৫

রেজাউল হক কৌশিক

উত্তরবঙ্গের কৃষির উন্নয়নে ভূমিকা রাখার জন্য কাজ করে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)। তবে বিশেষায়িত এ ব্যাংকটির নিজেদের সমস্যা সমাধানেই সবসময় ব্যস্ত থাকতে হয়। ফলে যে উদ্দেশ্যে ব্যাংকটি গঠিত তার পুরো সুফল পাচ্ছে না কৃষক। ব্যাংকের সমস্যা দিন দিন বাড়ছে। ব্যাংকের মূল কাজ গ্রাহকদের ঋণ দেওয়া ও বিতরণ করা ঋণ আদায় করা। তবে এ ব্যাংক তা পারছে না। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। আর খেলাপি ঋণের কারণে একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। আর নগদ টাকার সংকটে থাকায় অন্যান্য সমস্যাতেও পড়ছে এ ব্যাংক।

রাকাবের প্রধান কার্যালয়ের কেন্দ্রীয় হিসাব বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংকের মোট বিতরণ হওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। বিতরণ হওয়া এ ঋণের মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ৩০ ভাগের ওপরে। ডিসেম্বর প্রান্তিকে এর চেয়ে কম খেলাপি ছিল। তখনই বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। ঋণের বিশাল অংশ খেলাপি হয়ে পড়ার কারণও জানতে চেয়েছিল তখন। একই সঙ্গে কীভাবে খেলাপি ঋণ কমানো যায় সে বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা জানতে চাওয়া হয়েছিল।

২০১৯ সালের ৩০ জুনভিত্তিক শ্রেণিকৃত ঋণের ত্রৈমাসিক বিবরণী পর্যালোচনায় দেখা যায়, সে সময় এ ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণের হার ছিল ২০ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে ১০ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে। ওই সময়ে এ ব্যাংকের ঋণ ও আমানতের হার ছিল ৯৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের জুন শেষে এ হার নেমে দাঁড়িয়েছে ৯৩ শতাংশে। যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত হারের চেয়ে অনেক বেশি।

অন্যদিকে রাকাবের মূলধন ঘাটতিও বাড়ছে ব্যাংকটির। গত জুন পর্যন্ত এ ব্যাংক এক হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। আগের বছরের জুন পর্যন্ত মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৭০৪ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে রাকাবের নিট লোকসান হয়েছে ৬০৩ কোটি টাকা। আগের বছরে অবশ্য লোকসানের পরিমাণ কম ছিল। সে সময় মাত্র ৪৪ কোটি টাকা লোকসান ছিল। ২০১৮ সালেও লোকসান ছিল। সে বছরে পৌনে সাত কোটি টাকা লোকসান করেছিল এ ব্যাংক। ব্যাংকের ৩৮৩টি শাখার মধ্যে ১৯৫টিই লোকসানী শাখা। বাকি শাখাগুলো মুনাফা অর্জন করলেও পরিমাণে তা খুবই সামান্য।

ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা যখন এমন তখন ব্যাংকটির তহবিল ব্যবস্থাপনায় বড় অংশের অর্থ চলে যাচ্ছে। বর্তমানে ঋণ ও আমানতে সুদের হার কমলেও উলটো ঘটনা ঘটেছে রাকাবের ক্ষেত্রে। ব্যাংকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমানতের সুদের হার কমলে তহবিল ব্যবস্থাপনার ব্যয়ও (কস্ট অব ফান্ড) কমে। ২০১৮ সালের জুনে যেখানে তহবিল ব্যয় ছিল ৯ দশমিক ১২ শতাংশ সেখানে গত জুনে ব্যয় হয়েছে ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ। আমানতের সুদের হার কমার পরও অবস্থা এমন হওয়ায় হিসাব বিভাগের কর্মীদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ব্যাংকাররা।

গত বছর ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে যোগ দিয়েছেন এ কে এম সাজেদুর রহমান খান। তিনি দেশের বড় ব্যাংক সোনালি ব্যাংকের ডিএমডি ছিলেন। বড় প্রতিষ্ঠান চালিয়ে আসার পরও ছোট প্রতিষ্ঠান চালাতে এমন সমস্যায় কেন পড়ছেন সে বিষয়টি বুঝতে পারছেন না ব্যাংকাররা। অন্যদিকে চলতি বছরে এ ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসাবে সাবেক সিনিয়র সচিব রাইসুল আলম মণ্ডল যোগ দিয়েছেন। তবে ব্যাংকের সমস্যাগুলো সমাধানের বিষয়ে তার আন্তরিকতার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। তিনি আমলাতান্ত্রিকতার বাইরে বের হতে পারছেন না। দীর্ঘদিন ধরেও এই প্রতিবেদন ফোন ও এসএমএস দিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি তাতে সাড়া দেননি।