এই পৃথিবীতে কাহার কামড়ে সবচাইতে অধিক মানুষের মৃত্যু হয়? এই প্রশ্নটির ছোট্ট উত্তরটি হইল—মশা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, সারা বিশ্বে বত্সরে ১০ লক্ষাধিক মানুষ মারা যাইতেছে মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হইয়া। বিজ্ঞানের কোনো শাখাতেই পৃথিবীর সব মশা মারিয়া ফেলিবার মতো কোনো অস্ত্র আবিষ্কৃত হয় নাই। এমনকি মশাবাহিত রোগের কার্যকর ভ্যাকসিনও নাই। কিছু কিছু রোগের ঔষধ থাকিলেও বহু ক্ষেত্রে সেই সকল জীবাণু ঔষধপ্রতিরোধী হইয়া পড়ে। বলা যায়, রক্তচোষা এই ক্ষুদ্র প্রাণীটিকে নাজেহাল করিতে মানুষ বহু ক্ষেত্রেই অসহায়।
বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার প্রজাতিরও অধিক মশা রহিয়াছে। গ্রীষ্মপ্রধান দেশে বিপজ্জনক এই প্রাণীটির উপস্থিতি বেশি। বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে ১১৩টি প্রজাতির মধ্যে তিন-চারটি প্রজাতির মশা খুবই ভয়ংকর। মশাবাহিত প্রধান প্রাণঘাতী ১০টি রোগের মধ্যে মধ্যে বর্তমানে সবচাইতে ভয়ংকর হইতেছে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, জিকা প্রভৃতি। বাংলাদেশসহ ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রহিয়াছে বিশ্বের শতাধিক দেশের প্রায় ২৫০ কোটি মানুষ। সম্প্রতি জানা গিয়াছে, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় ৭৫ কোটি জিন পরিবর্তন করিয়া দেওয়া এডিস মশা ছাড়িবার পরিকল্পনায় অনুমোদন দিয়াছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। ডেঙ্গু ও জিকার মতো প্রাণঘাতী রোগ বহনকারী এই মশার সংখ্যা কমাইতে একধরনের জেনেটিক্যালি মডিফায়েড মশা ছাড়িবার পরিকল্পনা নেওয়া হইলেও তাহাতে বাদ সাধিয়াছে পরিবেশবাদীরা। এই সকল মশা পরিবেশের ক্ষতি ও ‘অনিচ্ছাকৃত পরিণতি’র দিকে লইয়া যাইতে পারে মর্মে সতর্ক করিয়াছে পরিবেশবাদীদের একটি দল। ইহাকে তাহারা বলিয়াছে ‘জুরাসিক পার্ক এক্সপেরিমেন্ট’। তাহারা বলিতেছে, জিন পরিবর্তন করিয়া দেওয়া এই সকল মশা বাস্তুসংস্থানের সম্ভাব্য ক্ষতির কারণ হইয়া দাঁড়াইতে পারে এবং এই সকল মশার কারণে হাইব্রিড, কীটনাশকপ্রতিরোধী মশারও জন্ম হইতে পারে। তবে যতই বলা হউক, ইহা ‘জুরাসিক পার্ক এক্সপেরিমেন্ট’, মশা হইতে মিলিয়ন মানুষের প্রাণ বাঁচাইতে সম্ভাব্য সকল উপায় অবশ্যই বিবেচনা করা উচিত। সংশ্লিষ্ট গবেষকরা বলিতেছেন, কেবল স্ত্রী মশা মানুষকে কামড়ায় বিধায় তাহারা জিন পরিবর্তিত পুরুষ এডিস মশা ছাড়িতেছে। ইহারা স্ত্রী মশার সহিত মিলিত হইলে যেই স্ত্রী মশা জন্মাইবে সেইগুলি মানুষকে কামড়ানোর মতো বয়সে আসিবার আগেই মারা পড়িবে; আর যেই সকল পুরুষ মশা জন্মাইবে সেইগুলির মধ্যেও বদলাইয়া দেওয়া জিন থাকিবে। এইভাবে ধারাবাহিকভাবে স্ত্রী এডিস মশার সংখ্যা কমাইয়া ফেলা হইবে।
তবে এই প্রসঙ্গে বলিতে হয়, অতীতে ভারতীয় উপমহাদেশেই পুরুষ অ্যানোফিলিসের শরীরে শুক্রাণু তৈরির প্রক্রিয়া নষ্ট করিয়া প্রকৃতিতে ছাড়িয়া দিয়া ম্যালেরিয়া দমনের চেষ্টা করা হইয়াছিল। কিন্তু তাহা সফল হয় নাই। দেখা গিয়াছিল, স্ত্রী মশা সঙ্গী বাছাইয়ের সময় ল্যাবে তৈরি জেনেটিক্যালি মোডিফায়েড পুরুষ মশাগুলিকে পাত্তাই দিতেছে না। সুতরাং গবেষণাগারের সাফল্যই শেষ কথা নহে। যদিও এইবারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা দাবি করিতেছে, ইতিমধ্যে তাহাদের এই পদ্ধতিতে ব্রাজিল, পানামা ও কেম্যান আইল্যান্ডের কোনো কোনো অঞ্চলে এডিস মশার সংখ্যা বহুলাংশে কমাইয়া আনা সম্ভব হইয়াছে। আমরা নিশ্চয়ই আশাবাদ ব্যক্ত করিব। কারণ, ইহা সারা বত্সরে মিলিয়ন জীবন বাঁচাইবার প্রশ্ন।
