বৃষ্টি ও জোয়ারে প্লাবিত উপকূল

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২০, ২২:২৪

বিভিন্ন স্থানে জোয়ারের পানিতে নতুন করে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বরিশাল বিভাগের ১২৫টি নদনদীর পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করেছে। ২০ বছরের মধ্যে কীর্তনখোলার পানি সর্বোচ্চ লেভেল অতিক্রম করেছে। নগরীর খালগুলো বিলুপ্ত হওয়ায় তলিয়ে রয়েছে প্রধান প্রধান সড়কসহ বিভিন্ন এলাকা। সাতক্ষীরায় বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়েছে এলাকায়। রায়পুরে বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়ে পড়েছে। শরণখোলা, কাঠালিয়া, ভোলার তজুমদ্দিন ও সাতক্ষীরার মোরেলগঞ্জ ও শ্যামনগরে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে ফসলের ক্ষতিসহ মত্স্যঘের ও বাড়িঘর পানিতে ডুবে গেছে। স্থানীয়রা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর :

শাহীন হাফিজ বরিশাল থেকে জানান, টানা চতুর্থ দিনের মতো কীর্তনখোলা নদীর পানি নগরীতে প্রবেশ করায় অধিকাংশ এলাকায় প্লাবন দেখা দিয়েছে। এতে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট তলিয়ে রয়েছে। বরিশাল বিভাগের ১২৫টির মধ্যে বেশির ভাগ নদনদীর পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড দক্ষিণাঞ্চল জোনের প্রধান প্রকৌশলী মো. হারুন অর রশিদ জানান, বিভাগের ১৫টি নদীর ১৭টি পয়েন্টের মধ্যে ১৫টিতে পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, গত ২০ বছরের মধ্যে কীর্তনখোলা নদীর পানি সর্বোচ্চ লেভেল অতিক্রম করেছে। সর্বশেষ শুক্রবার সন্ধ্যায় কীর্তনখোলা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে ২ দশমিক ৯৮ সেন্টিমিটারে অবস্থান করছিল। রাতে পানি আরো বৃদ্ধি পাবে বলে কর্মকর্তারা জানান।             এদিকে প্রবল বৃষ্টি ও অস্বাভাবিক জোয়ারের কারণে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ভাঙন ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দেখা দিয়েছে। নগরীর নিম্নাঞ্চল থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা পানিতে ডুবে গেছে। বরিশাল আবহাওয়া অফিস সূত্র জানায় শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত গত ৪৮ ঘণ্টায় ৬৫ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। সকাল থেকে বরিশালে বৃষ্টিপাতের কারণে জনজীবনে দুর্ভোগ আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। একদিকে জোয়ারের পানিতে ডুবেছে বিভিন্ন এলাকা আবার অপরদিকে টানা বৃষ্টিপাতে এই পানি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অনেকে বলেছেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল না থাকায় পানি নামতেও পারছে না। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে নদীতীরবর্তী বাসিন্দারা। সদর উপজেলার লামচরি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সেখানকার নদীভাঙনে সড়ক বিলীন হয়ে গেছে। এতে ঐ এলাকার বাসিন্দাদের চলাচলে মারাত্মক ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। বরিশালের দ্বীপ উপজেলা মেহেন্দিগঞ্জের পাতারহাট বন্দর, বাকেরগঞ্জের কবাই, নলুয়া, দুর্গাপাশা, হিজলার পুরাতন হিজলা, হরিনাথপুর, গুয়াবাড়িয়া, ধুলখোলাসহ কয়েকটি ইউনিয়ন ও সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদ, চড়বাড়িয়া, রায়পাশা-কড়াপুর ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

সাতক্ষীরা :আশাশুনি সদর, প্রতাপনগর ও শ্রীউলা ইউনিয়নে ভাঙনকবলিত এলাকার প্রতিরক্ষা রিংবাঁধ ভেঙে নতুন করে এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে জোয়ারের পানির চাপে দয়ারঘাট হ্যাচারি ও স্কুলের সামনে রিংবাঁধ ভেঙে এবং আরো কয়েকটি স্থানের বাঁধ ভেঙে প্রবল গতিতে নদীর পানি ভিতরে ঢুকছে।

শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) :ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ সংস্কার না করায় কয়েক মাস যেতে না যেতে গত বৃহস্পতিবার প্রবল জোয়ারে ২০০ ফুট ভেঙে ছয়টি স্থান দিয়ে কপোতাক্ষ নদীর লোনা পানি ভিতরে ঢুকে পাঁচ গ্রাম প্লাবিত হয়। শ্যামনগর পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাজ্জাদুর রহমান বলেন, ভাঙনকৃত স্থান মেরামতের জন্য জিও ব্যাগ, বাঁশ ও প্রয়োজনীয় মালামাল কূলে পৌঁছে গেছে। স্থানীয়দের সহায়তায় বেড়িবাঁধ সংস্কারের কাজ চলছে।

মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) :জোয়ারের সঙ্গে টানা বর্ষণে মোরেলগঞ্জ পৌরশহরসহ উপজেলার কমপক্ষে ২০ গ্রাম পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে রোপা আমন বীজতলা ও সবজিখেতের। পৌর মেয়র অ্যাডভোকেট মনিরুল হক তালুকদার জানান, জোয়ারের পানিতে পৌর সভার কার্পেটিং, কাঁচা-পাকা ও ইটসোলিং রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন জরুরিভিত্তিতে প্রয়োজন শহর রক্ষা বাঁধ।

শরণখোলা (বাগেরহাট) :টানা এক সপ্তাহের ভারী বৃষ্টিপাতে শরণখোলায় গ্রামাঞ্চলে ফসলের মাঠঘাট ডুবে যাওয়ায় কৃষকের চাষাবাদ বন্ধ হয়ে গেছে। শুক্রবার সরেজমিন উপজেলার খোন্তাকাটা, ধানসাগর, মঠেরপাড়, নলবুনিয়া, রাজাপুর ও খাদা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ফসলের মাঠ বৃষ্টির পানিতে ডুবে আছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার সরদার মোস্তফা শাহীন বলেন, টানা বর্ষণে উপজেলার সর্বত্র ফসলের মাঠ ডুবে যাওয়ায় কৃষকের চাষাবাদ বন্ধ থাকার খবর পেয়েছি।

মোংলা (বাগেরহাট) :আকস্মিক নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেল ও মোংলা নদীর পাড়ে নির্মিত পৌরসভার মেরিন ড্রাইভ সড়কটি চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। পৌর শহরের কুমারখালী থেকে শুরু করে কাইনমারী পর্যন্ত ৫ কিলোমিটারের এ মেরিন ড্রাইভ সড়কটি নির্মাণ করে মোংলা পোর্ট পৌরসভা। পৌর কর্তৃপক্ষের নির্মিত এ মেরিন ড্রাইভ সড়কটি পৌর শহর রক্ষা বাঁধ হিসেবে কাজ করছে। তবে গত কয়েক দিন ধরে চলে আসা টানা বৃষ্টিপাত ও লঘুচাপের প্রভাবে মোংলার পশুর এবং মোংলা নদীর পানি আড়াই থেকে তিন ফুট বৃদ্ধি পাওয়ায় পানির চাপে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে এই মেরিন ড্রাইভ সড়ক ও স্লুইস গেইট তিনটি।

রায়পুর (লক্ষ্মীপুর) :রায়পুর উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের অস্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে মেঘনা নদীতীরবর্তী প্রায় ২০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে লোকালয়ে জোয়ারের পানি বাড়তে শুরু করে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরীন চৌধুরী বলেন, ফের এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা হবে।

কাঠালিয়া (ঝালকাঠি) :বিষখালী নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে চার-পাঁচ ফুট বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার দুপুরে উপজেলা সদরের ইউনিয়ন পরিষদ ও হাসপাতাল সংলগ্ন রাস্তাসহ বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে। বেড়িবাঁধ না থাকায় বিষখালী নদীর পানি ঢুকে অনেক কাঁচা ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে এবং ভেসে গেছে অনেক পুকুরের মাছ। আমন বীজতলার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

তজুমদ্দিন (ভোলা) :তজুমদ্দিন উপজেলায় জোয়ারে চরাঞ্চলসহ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে বেড়িবাঁধ, কাঁচা ঘরবাড়ি, পুকুরের মাছসহ বিভিন্ন প্রকল্প ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃহস্পতিবার  দুপুরের জোয়ারে উপজেলার স্লুইস গেট, গুরিন্দা ও মহেশখালী এলাকার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ড ডিভিশন-২ উপসহকারী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম জানান, তজুমদ্দিনে বেড়িবাঁধে ব্লক ও জিও ব্যাগ কাজ চলমান আছে। ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ সংস্কারের জন্য ঠিকাদারকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

মীর্জাগঞ্জ (পটুয়াখালী) :উপজেলার স্থানীয় শ্রীমন্ত নদের জোয়ারের পানিতে গতকাল শুক্রবার আন্দুয়া গ্রামে ওয়াপদা বেড়িবাঁধ অনেকাংশ ভেঙে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এতে প্রবল বেগে পানি ঢুকে ইউনিয়নের আন্দুয়া, কলাগাছিয়া ও কালিকাপুর গ্রাম প্লাবিত হয়। মীর্জাগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মো. মনিরুল হক শ্রীমন্ত নদের তীরে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ অতিশিগিগর মেরামতের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছেন।