প্রজ্ঞা আহম্মদ জ্যোতি
এটা তোমাদের বাড়ি? তোমরা কি এই দেশের রাজা? স্টেশনে বাস করা ছিন্নমূল বাচ্চা মেয়েটি পুতুলদের মস্ত বাড়ি দেখে পুতুলকে এই কথাটি জিজ্ঞেস করেছিল। হুমায়ূন আহমেদের গল্প অবলম্বনে মোরশেদুল ইসলামের পরিচালিত ২০০৬ সালের দূরুত্ব সিনেমার শেষের দিকের কথোপকথন ছিল এটি। সিনেমাটির গল্প গড়ে উঠেছিল বড়লোক বাবা-মায়ের ব্যস্ততায় বুয়ার কাছে বেড়ে উঠতে থাকা পুতুল এবং স্টেশনে বাস করা ছিন্নমূল দুজন ভাইবোনকে নিয়ে। এই গল্পটি সিনেমার হলেও এমন হাজার হাজার ছিন্নমূল শিশু ঘুরে বেড়াচ্ছে ফ্লাই ওভারের নিচে এবং স্টেশন থেকে শুরু করে সারা দেশে। যাদের আমরা সাধারণত টোকাই বলে ডেকে থাকি। একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখের বেশি পথশিশু আছে। যারা সবাই বেড়ে উঠছে অনিশ্চিত ভবিষত্ নিয়ে। অনেকেই জানে না তাদের মা-বাবার পরিচয়। এদের বেশির ভাগই মাদকাসক্ত।
সন্ধ্যা নামলেই ফুটপাতের কোনায় বা রেললাইনের পাশে এই ছোট ছোট শিশুকে মাদক নিতে দেখা যায়। সমাজের অনেক অসাধু লোক আছে, যারা এই শিশুদের অনিশ্চিত ভবিষ্যেক আরো অনিশ্চিয়তার দিকে ঠেলে দেয়। এই শিশুদের তারা ব্যবহার করে মাদক পাচারসহ বিভিন্ন জঘন্য কর্মে। ছেলেমেয়ে উভয় লিঙ্গের পথশিশুরা হয় যৌন নির্যাতনের শিকার। অনেক শিশু আছে, যারা একাধিকবার যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে এবং হচ্ছে। এত সবের মাঝেও দিনের পর দিন বাড়ছে পথশিশুদের সংখ্যা। যারা বড় হয়ে জড়িয়ে পড়ে নানারকম অপরাধমূলক কাজে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উদ্যোগ বা প্রকল্পের ব্যবস্থা করা হলেও সেসব পুরোপুরি সফল না।
পৃথিবী জুড়ে মহামারি করোনা ভাইরাসের সময় সবচেয়ে বেশি বিপাকে আছে পথশিশুরা। যাদের জীবনেই কোনো সুরক্ষা নেই, তারা কীভাবে করোনা থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবে! করোনা থেকে বাঁচতে ঘরে সুরক্ষিত থাকার যে স্লোগান পৃথিবী জুড়ে দেওয়া হচ্ছে, সেটি হয়তো এই শিশুদের ক্ষেত্রে হাস্যকর। কারণ, এদের অনেকেই জানেনা ঘরে থাকা আসলে কেমন। কখনো তারা পায়নি ঘরের মায়া। অনেক পথশিশুই আছে, যারা দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগেও পায় না চিকিত্সাসেবা। জন্মের পর থেকে কখনো আসতে পারে না ডাক্তারের সান্নিধ্যে। অনেক ব্যক্তিবিশেষে আমরা দেখি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আয়োজনে পথ শিশুদের জন্য খাবারের আয়োজন করতে। তাদের কাছে অনুরোধ, এই আয়োজনগুলো শুধু একটি বিশেষ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এগিয়ে আসুন। পরিবর্তন করতে সাহায্য করুন এই শিশুদের জীবন। যাতে এই শিশুরা অন্য শিশুদের মতোই সব অধিকার নিয়ে সুন্দরভাবে বেড়ে উঠতে পারে। সেলফিতে ভালো কাজের স্মৃতি হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে সেলফির মতোই সুন্দর করে উঠতে সহযোগিতা করুন এই শিশুদের জীবন। সবচেয়ে খারাপ লাগে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চ শিক্ষার প্রাঙ্গণে যখন দেখি হকার বা টোকাই হয়ে এই শিশুদের ঘুরে বেড়াতে। তারা বেড়ে উঠছে এমন একটি উচ্চ শিক্ষার জায়গায়, যেখানে নিজেরা পাচ্ছে না শিক্ষার কোনো আলো। অনেক শিক্ষার্থীদের দেখি নিজস্ব উদ্যোগে এই শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা দিতে এগিয়ে আসেন। কিন্তু সহযোগিতার অভাবে তাও এক সময় থেমে যায়। এর জন্য হাত বাড়িয়ে দিতে হবে সরকারসহ সমাজের প্রভাবশালীদের। নিতে হবে বিশেষ পদক্ষেপ।
একবার স্টেশনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ট্রেন আসতে দেরি করছিল। তখন এক শিশু হকার আসে আমার কাছে পত্রিকা বিক্রি করতে। সেই ফাঁকে কথা হয় তার সঙ্গে। সে আমাকে বলে, ‘আমি তো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পেপার বেচি। পড়মু তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।’ আশীর্বাদ করি পূরণ হোক তার সেই স্বপ্ন। পূরণ হোক সেই শিশুর মতো সব পথশিশুর স্বপ্ন।
n লেখক :শিক্ষার্থী, নাট্যকলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
