আস্থার ঘাটতিতে বিনিয়োগ আসছে না

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২০, ২২:১৭

অতীতে শেয়ারবাজারকে জুয়ার ক্যাসিনো হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা ছিল

ইত্তেফাক রিপোর্ট

দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকারি পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ আসছে না। প্রত্যাশিত বিনিয়োগ না আসার জন্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার ঘাটতিকে অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) এক অনলাইন সেমিনারেও (ওয়েবিনার) এই ইস্যুটি ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে। এছাড়া দুর্নীতি, মাত্রাতিরিক্ত করকাঠামো ও শুল্ক বিভাগের কার্যক্রমে ধীরগতি, সরকারি বিভিন্ন নীতির স্থায়িত্ব না থাকা, ভূমি নিবন্ধনে জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, শ্রম আইন ও অধিকার মানার ক্ষেত্রে উদাসীনতাসহ বেশ কিছু বিষয় উঠে এসেছে। এ সময় বক্তারা বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আসতে হলে আগে স্থানীয় বিনিয়োগ বাড়তে হবে। এজন্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে হবে। বর্তমান বিনিয়োগকারীরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলেই ভবিষ্যতের বিনিয়োগ আসবে।

ডিসিসিআইয়ের সভাপতি শামস মাহমুদের সঞ্চালনায় ঐ ওয়েবিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প উন্নয়নবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। তিনি জানান, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগকারীরা সমান সুুবিধা ভোগ করবেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও কূটনীতিবিদেরা বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও তা উত্তরণে তাদের মতামত তুলে ধরেন। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. এম মাশরুর রিয়াজ।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নায়োকি এশিয়ার তুলনায় বাংলাদেশে জাপানের বিনিয়োগের একটি হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০১৯ সালে জাপান এশিয়ার দেশগুলোতে বিনিয়োগ করেছে ৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশে এসেছে মাত্র  শূন্য দশমিক ০৯ শতাংশ!

বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বৃদ্ধির আগ্রহের কথা জানানোর পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও তুলে ধরেন। বিদ্যমান করকাঠামো, শুল্ক ছাড়ের প্রক্রিয়া, বৈদেশিক বিনিময় হার ব্যবস্থার পুনর্গঠনসহ বাণিজ্যিক কার্যক্রম সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেন। অন্যদিকে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় কিছু নিয়ম-নীতি নিয়েও আপত্তির কথা জানান।

ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন জোয়ানে ওয়েগনার বাংলাদেশে বিনিয়োগে তার দেশের আগ্রহের বিষয়টি উল্লেখ করে একই সঙ্গে এখানে দুর্নীতির ইস্যুটিও তোলেন। তিনি বলেন, এটি বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি সংকেত। এছাড়া শ্রম অধিকার ও তাদের নিরাপত্তা, বিশেষত তৈরি পোশাক খাতে শ্রম অধিকার ইস্যুটি নিয়ে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানান। তিনি বলেন, এসব বিষয় ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বিনিয়োগ বাড়াতে দ্বিপাক্ষিক ভিত্তিতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার ওপর গুরুত্ব দেন। এছাড়া বেশ কিছু বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের মতের সঙ্গে একমত প্রকাশ করে তিনি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরেন। এ সময় তিনি বলেন, বেজায় জমির যে মূল্য ধরা হচ্ছে, তা প্রতিযোগী অন্য দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম।

সালমান এফ রহমান সম্প্রতি বিনিয়োগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনার কথা তুলে ধরে বলেন, দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কোনো বৈষম্য থাকবে না। শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানি কিছু সুবিধা না পাওয়া ইস্যুতে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর তা আগামী মাস থেকে সমাধান করা হবে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক নেতৃত্বের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি এসেছে যে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে আমাদের সংস্কার করতে হবে। এখন যারা মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা আছেন, তাদের মনোভাবে পরিবর্তন আনতে হবে।

ওয়েবিনারে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন ডিসিসিআইয়ের সিনিয়র সহসভাপতি এন কে এ মোবিন, অ্যামচেমের সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহীম, বিল্ডের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম খান, জেট্রোর এদেশীয় প্রতিনিধি ইয়ুজি আনদো প্রমুখ।

আলোচনার এক পর্যায়ে দেশের শেয়ারবাজার প্রসঙ্গ তোলেন সালমান এফ রহমান। এ সময় শেয়ারবাজারের উন্নয়নে বর্তমান নেতৃত্বের নেওয়া পদক্ষেপের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এ কারণে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। তিনি বলেন, অতীতে স্টক মার্কেটকে জুয়ার ক্যাসিনো হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা ছিল। কিন্তু পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। মানুষ এখন সচেতন হয়েছে। সঠিক শেয়ার বেছে নিচ্ছে। যখনই কোনো সন্দেহ দেখা দিচ্ছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা সময়মতো পদক্ষেপ নিচ্ছে। দীর্ঘসূত্রতা এখন নেই।