চট্টগ্রাম সাতক্ষীরা হাতিয়া বোরহানউদ্দীন ও বাকেরগঞ্জের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, কালিয়ায় শতবর্ষী বাজার পানির নিচে
ইত্তেফাক ডেস্ক
সামুদ্রিক অস্বাভাবিক জোয়ার ও কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বেড়িবাঁধ ভেঙে পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। এর মধ্যে নোয়াখালীর হাতিয়ায় ২০ হাজার মানুষ গৃহহীন ও লক্ষাধিক লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে, ভোলার বোরহানউদ্দিনে পানিবন্দি ১০ হাজার মানুষ, হুমকির মুখে বেড়িবাঁধ। পানিতে ভাসছে সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন, বরিশালের বাকেরগঞ্জে পৌরসভাসহ ১০০ গ্রাম প্লাবিত ও নড়াইলের কালিয়ায় পানির নিচে শতবর্ষী পেড়লী বাজার।
হাতিয়া (নোয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, অস্বাভাবিক সামুদ্রিক জোয়ারের তোড় ও গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণে পৌরসভা ব্যতীত উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ২০ হাজার লোক গৃহহীন ও লক্ষাধিক লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বিধ্বস্ত হয়েছে কয়েক শ ঘরবাড়ি। নিঝুমদ্বীপ, হরণী, চানন্দী, সুখচর, নলচিরা, তমরদ্দি ও সোনাদিয়া ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ দিন যাপন করছে। এসব এলাকার বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, দোকানপাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চার/পাঁচ ফুট পানিতে নিমজ্জিত। গৃহহীন মানুষজন পরিবার পরিজন নিয়ে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাউল করিম ও জেলা প্রশাসক মো. খুরশিদ আলম খান ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেছেন। এদিকে অসহায় ও দুর্গতদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন সাবেক এমপি ও হাতিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ্ব মোহাম্মদ আলী।
পানিতে ভাসছে সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলার ইউনিয়ন
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দিনভর কখনো গুঁড়িগুঁড়ি, কখনো মুষলধারে বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন স্থানের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ভয়ংকর অবস্থা বিরাজ করছে আশাশুনি উপজেলার সদর প্রতাপনগর ও শ্রীউলা ইউনিয়ন এবং শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নে। আম্ফান দুর্গত এসব এলাকায় পূর্ব থেকে ভাঙা বাঁধ এবং আমাবশ্যার জোয়ারের পানির প্রবল চাপে নতুন করে বেড়িবাঁধ ভেঙে অধিকাংশ গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। রাস্তাঘাট, ব্রিজ কালভার্ট, মাছের ঘের, ফসলের জমি সব একাকার। আশ্রয়হীন মানুষ নিজেদের বাসতভিটা ফেলে অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ছুটছে। কোটি কোটি টাকায় নির্মিত পাকা সড়কগুলো জোয়ারের পানির তোড়ে ধ্বংস প্রায়। গ্রামের পর গ্রাম বানের পানিতে থইথই করছে। মৃত ব্যক্তিদের দাফন বা সত্কারের এতটুকু জায়গা নেই। অবলা পশুগুলোকে ফেলে গৃহস্থালিরা বেরিয়ে পড়ছে আশ্রয়স্থলের সন্ধানে। শ্যামনগর উপজেলার গাবুরার লেবুবুনিয়ায় ঝাপালির সাতটি পয়েন্ট ভেঙে গেছে। আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগরের ২১টি গ্রামের সবকটিই পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব এলাকায় ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
পানিবন্দি বোরহানউদ্দিনের ১০ হাজার মানুষ
বোরহানউদ্দিন (ভোলা) সংবাদদাতা জানান, অস্বাভাবিক জোয়ারে বেড়িবাঁধের বাইরে অবস্থানকারী চার ইউনিয়নের প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। হুমকির মুখে আলিমুদ্দিন বাজার থেকে শেল্টার বাজার পর্যন্ত শহর রক্ষা বাঁধ। শুক্রবার বিকালে সরেজমিন দেখা যায়, বেড়িবাঁধের বাইরের ঘরগুলো পানিবন্দি হয়ে রয়েছে। পানিবন্দি আলিমুদ্দিন বাজারের আব্দুল বারেক, বাবুল, মোস্তফা বলেন, জোয়ার আসার আগে ঘর ছাড়ি, ভাটা হলে ঘরে আসি। রান্না-বান্নার অভাবে অনেকবেলা উপোস থাকতে হয়। রাতে জোয়ার আসলে বেড়িবাঁধের ভেতরে বসবাসকারীদের বাড়িতে রাত কাটাই। এখানে বসবাসকারী ২৪টি পরিবারের দিন কাটছে এভাবেই।
বড় মানিকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন হায়দার বলেন, তার ইউনিয়নের ৫, ৬, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মানুষ পানিবন্দি। বিশেষ করে বেড়িবাঁধের বাইরে বসবাসকারীদের অবস্থা খুবই করুণ। তিনি জরুরি ভিত্তিতে এ সমস্ত মানুষের জন্য সহায়তার দাবি জানান। পক্ষিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাগর হাওলাদার জানান, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের একাংশের মানুষ পানিবন্দি। টবগী ইউপির ছলেমান মেম্বার জানান, তার ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডটি বেড়িবাঁধের বাইরে। হাসাননগর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের একই অবস্থা। এ দুই ওয়ার্ডে প্রায় ৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি জীবনযাপন করছেন। পানিবন্দি হয়ে দুর্বিষহ দিন কাটাচ্ছেন এসব বানভাসি মানুষ।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুর রহমান জানান, বিষয়টি জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হয়েছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বাকেরগঞ্জ পৌরসভাসহ ১০০ গ্রাম প্লাবিত
বাকেরগঞ্জ (বরিশাল) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার নদীতীরবর্তী চৌদ্দটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার অস্বাভাবিক বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে কমপক্ষে ১০০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। গত বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত এ এলাকায় ভারী বর্ষণ ও জোয়ারের পানি ব্যাপকভাবে বেড়ে প্রায় পাঁচ ফুট উচ্চতায় অবস্থান করে রাস্তাঘাট, ফসলি জমি, ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও মাছের ঘের ডুবে যায়। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে লক্ষাধিক মানুষ।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাধবী রায় বলেন, স্থানীয় চেয়ারম্যানদের সহযোগিতায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে প্লাবিত এলাকার সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির বিবরণী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠানো হয়েছে।
পানির নিচে কালিয়ার শতবর্ষী পেড়লী বাজার
কালিয়া (নড়াইল) সংবাদদাতা জানান, জোয়ারের পানিতে তলিয়ে প্রায় অচলাবস্থায় পড়েছে উপজেলার ১০০ বছরের পুরোনো পেড়লী বাজার। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন এই বাজারের ব্যবসায়ীসহ এলাকার সাধারণ জনগণ। এই সমস্যা সমাধানে নদীর তীরে বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
কালিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কৃষ্ণপদ ঘোষ বলেন, পেড়লী বাজার ভাঙনের কবল থেকে রক্ষার জন্য এরই মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলীকে অনুরোধ করা হয়েছে। তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন।
