অণুগল্প

ক্ষুধা

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২০, ২০:৫৮

বুলু রানী ঘোষ

 

ত্রস্ত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে রীমা, এদিক ওদিক সন্তর্পণে তাকায়। নাহ! রুহি বা রিফাত কেউ নেই আশেপাশে। বহু ব্যবহারে মলিন হয়ে যাওয়া শাড়ির আঁচলটা ভালো করে মাথায় টেনে দিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটতে থাকে রীমা। অনেকটা পথ যেতে হবে কিন্তু কিছু দূর না যেতেই হাঁপিয়ে ওঠে। পা দুটো যেন চলতেই চাইছে না আর। মাথার ওপর কড়া রোদের ছটা। মোল্ল­াবাড়ির পিছনের আলের রাস্তাটা ধরে এগোতে থাকে। কান খাড়া করে কিছু শোনার চেষ্টা করে রীমা, হ্যাঁ ঐ তো শুনতে পাচ্ছে ওর কাঙ্ক্ষিত আওয়াজ। আরো জোরে পা চালায় রীমা।

ঠিক দু’ঘণ্টা পর। রীমার হাতে বড়সড় একটা পুটুলি। অনেকটাই ওজন, তবে ওর কাছে অতটা ভারী মনে হয় না, যতটা ভারী লাগছে বুকের ভিতরটা।

রীমা চেয়ারম্যান বাড়ির সেজো মেয়ে, ভালোবেসে ঘর ছেড়েছিল লজিং মাস্টার হুমায়ুনের সঙ্গে তাও আজ বছর পনেরো হবে। ঘর ছেড়েছিল নয়, তবে ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। হুমায়ুনের প্রতি রীমার দুর্বলতা টের পেয়ে ওর বাবা আর ভাই মিলে হুমায়ুনকে বেধড়ক পিটিয়েছিল আর চুরির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য করেছিল। পরের সন্ধ্যায় রীমাও ঘর ছেড়ে এসে উঠেছিল হুমায়ুনের টিনের ছাপড়ায়।

হুমায়ুন অর্থবিত্তে না পারলেও ভালোবাসায় ভরিয়ে রেখেছিল ওকে। তারপর কত হুমকি, কত প্রলোভন, কত অভাব-দারিদ্র্যে রীমা মাথা নোয়ায়নি ঐ চেয়ারম্যান বাড়ির কাছে। গলার ক্যান্সারে ভুগে দুই বছর আগে হুমায়ুন যেদিন ওকে আক্ষরিক অর্থেই নিঃস্ব করে রেখে চলে গিয়েছিল, সেদিনও রীমা হুমায়ুনের ভালোবাসার চিহ্ন রুহি আর রিফাতকে বুকে জড়িয়ে বাঁচতে সেলাই মেশিন হাতে তুলে নিয়েছিল। সারা পৃথিবী জুড়ে হঠাত্ এ কোন দুর্যোগ। করোনা মহামারি। 

গত দুই মাস কেউ কোনো কাপড় সেলাই করতে দেয়নি। লজ্জার মাথা খেয়ে দুই-এক পরিচিত বাড়িতে ঝিয়ের কাজও করতে চেয়েছিল—কেউ রাখেনি, ভাইরাসের ভয়ে। ভাগ্যিস রোজার মাস। সারা দিন রোজার অজুহাতে কাটলেও ইফতার আর সেহেরিতে কিছু তো খেতে হয়। কাল সেহেরিতে এক বাটি ভাত দুই ভাইবোন ভাগ করে খেয়েছে। আর রীমা শুধু দুই গ্ল­াস পানি।

গত পরশু মাইকিং শুনেছিল রমিজ চেয়ারম্যানের বাড়িতে রিলিফ দেবে। পনেরো বছর যেখানে মাথা নোয়ায়নি, আজ ঘোমটার আড়ালে মুখ ঢেকে মাথা নুইয়ে হাত পেতে নিতে হলো পেটের জ্বালানি। রীমার দুই চোখ বেয়ে টপটপ করে পড়ছে উষ্ণ অশ্রুধারা, কিন্তু তা ছাপিয়ে সে দেখতে পাচ্ছে ছেলেমেয়ে দুটোর সামনে ধোঁয়াওঠা গরম ভাতের থালা। হায় রে ক্ষুধা!