লাল ফিতার দৌরাত্ম্য জাদুঘরে যাইবে?

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২০, ২১:৪৪

বিশ্বে ইন্টারনেট আবিষ্কার হইয়াছে ৫১ বত্সর পূর্বে। তাহার পর হইতে সমগ্র বিশ্ব ক্রমশ আমূল পালটাইয়া যাইতেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে ডিজিটাল সেবা জনগণের হাতের মুঠোয় আনিয়া দিতে ১৮ হাজার উপজেলা অফিস এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের ৪০ হাজার অফিসকেও উচ্চগতির ইন্টারনেটের অধীনে আনা হইয়াছে। ইহার পাশাপাশি সেইখানে ই-নথি ব্যবহারের অধীনে আনিতে কাজ করিতেছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। আশা করা হইতেছে, ই-নথির মাধ্যমে লাল ফিতার দৌরাত্ম্যকে জাদুঘরে পাঠাইয়া দেওয়া হইবে। ইতিমধ্যেই সরকারের ৮ হাজার ২৩৪টি দপ্তর ই-নথি ব্যবহার করিতেছে। দ্রুততম সময়ে উপজেলা পর্যায়ের ১৮ হাজার অফিসে এবং ইউনিয়নের ভূমি অফিস ও ডিজিটাল সেবা সেন্টারসহ সকল জায়গায় এই ই-নথি চালু করিবার কথাও জানা গিয়াছে।

ইহা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ইতিবাচক ও তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা। ইহা ঠিক যে, ই-নথির হাত ধরিয়া ডিজিটাল নথির যুগে বাংলাদেশকে একসময় প্রবেশ করিতেই হইত। তাহা যত পূর্বে ঘটিবে ততই মঙ্গল। পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত তিনটি শিল্পবিপ্লব ঘটিয়াছে। এখন আমরা প্রযুক্তিবিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়াইয়া রহিয়াছি। প্রযুক্তিবিপ্লব পালটাইয়া দিয়াছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার চিরচেনা রূপ, যাহা মানুষ পূর্বে কল্পনা করিতেও পারে নাই। আর এই পরিবর্তনের সহিত মানাইয়া লইয়া আগাইয়া যাইতে যেই প্রস্তুতি প্রয়োজন, সেই দিকে অগ্রসর হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। আমরা দেখিতেছি, জনগণের দোরগোড়ায় তথ্যসেবা পৌঁছাইয়া দিতে বিভিন্ন ধরনের তথ্য ও সেবার ক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশন করা হইতেছে। পর্যায়ক্রমে সরকারি অফিসগুলির সকল প্রকারের সেবামূল্য বা ফি আদায় হইবে ডিজিটাল পদ্ধতিতেই। ইহা ছাড়া সরকারি চাকুরিজীবীদের বেতন-ভাতা, পেনশন, অনুদান, ক্ষতিপূরণসহ সকল আর্থিক লেনদেনও হইবে অনলাইনে। ফলে সরকারনির্ধারিত সেবামূল্যের অধিক কোনো টাকা নেওয়া যাইবে না বলিয়া আশা করা যাইতেছে। অর্থাত্ দুর্নীতি হ্রাস পাইবে তাত্পর্যপূর্ণ মাত্রায়। ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে দুর্নীতি ও অনিয়মকে বহুলাংশে হ্রাস করা যায় বটে। তবে সেইখানেও কিছু কথা থাকিয়া যায়। ই-নথির মাধ্যমে যতই আশা করা হউক লাল ফিতার দৌরাত্ম্যকে জাদুঘরে পাঠাইবার, তাহা খুব সহজ হইবে বলিয়া মনে হয় না। ইহার প্রধান কারণ আমাদের মানসিকতা। অনিয়ম এই জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকিয়া গিয়াছে বলিয়া অনেকে মনে করেন। ইহার প্রমাণ অসংখ্য। উদাহরণ হিসাবে দেশের কিছু ভূমি অফিসের কথা বলা যাইতে পারে। ভূমির সহিত মানুষের আমৃত্যু সম্পর্ক। দেশের আদালতগুলিতে বিচারাধীন মামলার ৮৫ শতাংশই ভূমিবিরোধসংক্রান্ত। ভূমিসংক্রান্ত হয়রানি দূর করিতে ভূমিব্যবস্থাপনা ডিজিটালাইজড করিবার কাজ চলিতেছে। সকল জায়গায় ক্রমান্বয়ে চালু হইতেছে ই-নামজারির ব্যবস্থা। ইহার ফলে ভূমির ডিজিটাল তথ্যভান্ডার হইতে রেকর্ড ও নকশা পাওয়া যাইবে। ভূমির মালিকরা দাগ, খতিয়ান ও নকশা কম্পিউটারে প্রিন্ট করিয়া লইতে পারিবেন। কিন্তু এত ভালো উদ্যোগেও ‘ডিজিটাল জরিপ অ্যানালগ ঘুষ’ জাতীয় সংবাদ আমরা দেখিতে পাই।

প্রকৃতপক্ষে, যাহারা অনিয়ম করিতে চাহেন, তাহারা ডিজিটাল পদ্ধতির ভিতরেও ঠিক ফাঁকফোকর খুঁজিয়া নেয়। সুতরাং ডিজিটাল বাংলাদেশ করিবার পাশাপাশি ডিজিটাল যন্ত্রের পিছনে যাহারা কাজ করিবেন, তাহাদের মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন। আমরা আশাবাদী। ধীরে ধীরে নিশ্চয়ই ইহার ইতিবাচক পরিবর্তন আসিবে।