আমাদের দেশে দিনদিন মামলার জট বাড়িতেছে। সমগ্র দেশের আদালতগুলিতে লক্ষ লক্ষ মামলা বর্তমানে বিচারাধীন রহিয়াছে। ইহাতে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ যে কী পরিমাণে বাড়িয়াছে তাহা বর্ণনাতীত। ইহার মূল কারণ বিচারকসংকট। হাসপাতালে ডাক্তার-নার্স ও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষকসংকটের মতো আদালতে পর্যাপ্ত বিচারকের অভাব আমাদের একটি বড় সমস্যা। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রায় ৩৪ লক্ষ বিচারাধীন মামলার বিপরীতে আমাদের বিচারক রহিয়াছেন মাত্র ১ হাজার ৬৪৭ জন। ইহা দুই বত্সর পূর্বের হিসাব। বর্তমানে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৩৬ লক্ষ। ফলে জনগণের ভোগান্তিও বাড়িয়া চলিয়াছে সমান তালে।
সহযোগী একটি দৈনিকের খবরে বলা হইয়াছে যে, দেশে ৫০ আদালতে বিচারক নাই। শূন্যপদেও পদোন্নতিবঞ্চিত বিচারকরা। বিচারক নিয়োগে কেন এই অবহেলা তাহা আমাদের বোধগম্য নহে। গত বত্সরের ১ ডিসেম্বর আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে একটি করিয়া মোট সাতটি সাইবার ট্রাইব্যুনাল গঠনের অনুমোদন দেয়; কিন্তু শুধু ট্রাইব্যুনাল গঠন করিলেই চলিবে না, সেইখানে বিচারক নিয়োগ দিতে হইবে। বিচারক নিয়োগ না দেওয়ায় সেইগুলির কার্যক্রম এখনো শুরুই হয় নাই। ফলে বিভিন্ন জেলা হইতে ঢাকায় আসিয়া মানুষ বহু কষ্টে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করিতেছেন। পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী আমাদের দেশে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহার বাড়িতেছে। ইহার ফলে বাড়িতেছে সাইবার বা ডিজিটাল অপরাধপ্রবণতাও। ইহা নূতন ধরনের ক্রাইম, যাহা দিনদিন জটিল আকার ধারণ করিতেছে; কিন্তু তাহা মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি কি আছে? আমরা অন্যান্য বিভাগে সাইবার ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শুরু করিতে পারিলাম না, যাহা দুঃখজনক। শুধু সাইবার ট্রাইব্যুনাল নহে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের অবস্থাও তথৈবচ। গত মার্চ মাসে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নড়াইল, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, ঝালকাঠি ও পঞ্চগড় জেলায় একটি করিয়া মোট ছয়টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল গঠনের অনুমোদন দেয়; কিন্তু এই সকল ট্রাইব্যুনালেও বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয় নাই। এই জন্য পদোন্নতিবঞ্চিত বিচারকদের দ্রুত পদোন্নতি দেওয়া এবং নূতন করিয়া বিচারক নিয়োগদানে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা জোরদার করা জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।
এক পরিসংখ্যান হইতে জানা যায়, আমেরিকায় প্রতি ১০ লক্ষ জনসংখ্যায় বিচারক রহিয়াছেন ১০৭ জন, কানাডায় ৭৫ জন, ইংল্যান্ডে ৫১ জন, অস্ট্রেলিয়ায় ৪১ জন ও ভারতে ১৮ জন। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে রহিয়াছেন মাত্র ১০ জন। তবে বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় আমাদের দেশে মামলা নিষ্পত্তির হার অধিক। ইহা একটি আশাব্যঞ্জক দিক হইলেও জনবহুল দেশে জনসংখ্যা অনুপাতে বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা আবশ্যক। ইহা ছাড়া বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণগুলি সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করিয়া মামলার জট ক্রমান্বয়ে কমাইয়া আনা প্রয়োজন।
