বঙ্গীয় বদ্বীপে নদীভাঙন এক অনিবার্য বাস্তবতা

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২০, ২১:৫৭

আফজাল তাহফি রোহান

বঙ্গীয় বদ্বীপে হাজার বছর ধরেই নদীভাঙন এক অনিবার্য বাস্তবতা। পৃথিবীর বৃহত্তম এ বদ্বীপের নদীর পাড়ের বাসিন্দাদের কাছে এক আতঙ্কের নাম ভাঙন। অনেকের জীবন দুর্বিষহ হয়েছে এই ভাঙনে। কেউ হারিয়েছেন বসতভিটা ও পরিবার কেউ জীবিকা। বিলীন হচ্ছে হাজার হাজার হেক্টর জমি। চোখের পলকে স্কুল ভবন নদীগর্ভে নির্গলিত হওয়ার হূদয়ভেদী দৃশ্য অবলোকন করছে এদেশবাসী।

বাংলাদেশের প্রায় সব নদীর চূড়ান্ত উত্স উজানের হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল। ফলে পার্বত্য অঞ্চলে চাপের মধ্যে থাকা স্রোতঃস্বিনী পলল সমভূমিতে এসে এমনিতেই আড়মোড়া ভাঙতে চায়। স্রোত যখন প্রবল হয়, ভাঙন তখন আরো তীব্র হয়। এ কারণে বর্ষা মৌসুমের শুরুতে ও শেষে বাংলাদেশের বিভিন্ন জনপদ ভাঙনের মুখে পড়ে। নদীভাঙনকে সাধারণভাবে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বদ্বীপ অঞ্চলের নদনদীর ভাঙা-গড়াই নিয়তি। আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতিতেও এর ছাপ স্পষ্ট। কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত গান রয়েছে—‘এ কূল ভাঙে, ও কূল গড়ে, এই তো নদীর খেলা, এই তো বিধির খেলা। সকাল বেলার আমির রে ভাই, ফকির সন্ধ্যা বেলা’। কিন্তু বাংলাদেশে যেভাবে নদী একই এলাকা বছরের পর বছর ভেঙে চলে বা চলতে দেওয়া হয়; তার নজির আর কোনো বদ্বীপে আছে বলে মনে হয় না। চার দশকে বাংলাদেশ একটি আস্ত জেলার চেয়েও বেশি ভূমি নদীতে হারিয়েছে। একদিকে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি, অন্যদিকে নদীভাঙন দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সীমাহীন দুর্ভোগের কবলে ফেলেছে। আর সীমান্ত নদীভাঙনে গৃহহীন মানুষের অবস্থা আরো শোচনীয়। তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, ইছামতি, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, মেঘনা, ধলেশ্বরী, আড়িয়াল খাঁ, গড়াই, কর্ণফুলী, মধুমতী, সুরমা, কুশিয়ারা, পদ্মা, মহানন্দা, মুহুরী, শঙ্খ, করতোয়া প্রভৃতি নদনদীর ভাঙনে প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে; আর এতে করে বাড়ছে আশ্রয়হীন পরিবারের সংখ্যা। বাংলাদেশে নদীভাঙন প্রলয়ংকরী দুর্যোগের মতোই বিপজ্জনক হলেও ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের অবস্থা পরিবর্তনে সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে উন্নয়নমূলক প্রকল্প একেবারেই নামমাত্র। সিইজিআইএসের তথ্যানুযায়ী, নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে যারা আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে তাদের মধ্যে শতকরা ৫০ ভাগ লোক টাকাপয়সার অভাবে নতুন করে ঘরবাড়ি তৈরি করতে না পারায় গৃহহীনে পরিণত হয়। বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লাখ গৃহহীন ভাসমান মানুষ রয়েছে এবং প্রতি বছর এদের সংখ্যা গড়ে লক্ষাধিক করে বাড়ছে। ভাসমান এসব মানুষ সাধারণত বাঁধ, রাস্তা, পরিত্যক্ত রেল সড়ক, খাস চর বা খাস জমি প্রভৃতি স্থানে ভাসমান জীবন-যাপন করে। অভাবের তাড়নায় এরা শহরমুখী হয় এবং শহরের বস্তিগুলোতে বাড়তি জনসংখ্যার চাপে জর্জরিত।

নদীর ভাঙনের কারণগুলোর দিকে তাকালে কিন্তু মনে হয়, অনেক কিছুই আমাদের হাতে রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের কারণেই নদীভাঙন ঘটছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নদীর গতি রোখার চেষ্টার কারণে নদীভাঙন ঘটতে পারে। অনেক সময় নদীর মাঝখান দিয়ে আড়াআড়িভাবে বাঁধ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, যা ভাঙন সৃষ্টি করতে পারে। অবশ্য এই কাজ যদি একান্ত করতেই হয়, তাহলে আগে নদীর পাড় যথেষ্ট মজবুত করে নিতে হবে। অপরিকল্পিতভাবে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের চেষ্টাও নদীভাঙনের এক বড় কারণ।  বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে আমি দেখেছি যে, নদীর পাড়ে বেশ খানিকটা জায়গা ছেড়ে দিয়ে ভেতরের দিকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করা হয়। ফলে যে অংশ বাঁধের বাইরে থাকে সেই অংশ অরক্ষিত থাকে এবং অনেক সময় ভেঙে যায়। নদীর পাড়ের ঘাস, কাশবনসহ অন্যান্য বন উজাড় করে ফেললে মাটি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পানির তোড়ে ভাঙন সৃষ্টি হয়। এছাড়া অপরিকল্পিতভাবে নদী খনন বা ড্রেজিংয়ের কারণে ক্ষতির শিকার হয় নদী। আরেকটি বিষয় হচ্ছে দুর্নীতি।

বাংলাদেশ একটি পলিগঠিত বদ্বীপ। এখানে মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক উভয় কারণেই নদীভাঙনের সৃষ্টি হয়। এই দ্বীপে ভাঙা-গড়ার খেলা চলছে হাজার হাজার বছর ধরেই। সেই প্রাকৃতিক খেলা আমাদের পক্ষে বন্ধ করা কঠিন। কিন্তু আমরা মানুষরা, যেসব কারণ সৃষ্টি করেছি, সেগুলো রোধ করতে হবে। সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে নদীভাঙনের শিকার এলাকাগুলোর জন্য বরাদ্দ আরো বেশি দেওয়া যেতে পারে। বিদেশি অনেক সাহায্য সংস্থা অপরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে থাকে। দেশি অনেক সংস্থাও এরকম করে। সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে নদীভাঙন ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনা করলে ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে। এতে সুষ্ঠু বণ্টন হতে সহায়তা করবে। নদীতে চর জেগে উঠলে ভাঙনের শিকার ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে সুষম বণ্টন করা দরকার। এ ব্যাপারে প্রশাসন কঠোরতা অবলম্বন করতে পারে। এভাবে যদি করা যায়, তাহলে নিঃসন্দেহে নদীভাঙনের ক্ষতি রোধ সম্ভব হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়