নেতৃত্ব সংকটে বিমা খাত!

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২০, ০৩:০০

নেতৃত্ব সংকটে পড়েছে দেশের বিমা কোম্পানিগুলো। বিশেষ করে জীবন বিমা কোম্পানিগুলোতে এ সমস্যা প্রকট। দেশে কাজ করা ৩২টি জীবন বিমা কোম্পানির মধ্যে এখন অর্ধেক কোম্পানিতেই মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নেই। অন্যদিকে সাধারণ বিমা কোম্পানিগুলোও নানা সমস্যায় রয়েছে। করোনা পরবর্তীতে বিপাকে পড়বে বলেই আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। আর বিমা কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর চেয়ারম্যানের মেয়াদ শেষ হয়েছে। ফলে এ প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পদটি শূন্য রয়েছে।

জানা গেছে, ১৬টি জীবন বিমা কোম্পানিতে এখন সিইও নেই। কোনো কোনো কোম্পানি চলছে ভারপ্রাপ্ত সিইও দিয়ে। নিয়মিত সিইও না থাকা কোম্পানির মধ্যে রয়েছে, ন্যাশনাল লাইফ ইনসিওরেন্স, সানলাইফ ইনসিওরেন্স, পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনসিওরেন্স, সানফ্লাওয়ার লাইফ ইনসিওরেন্স, এনআরবি গ্লোবাল লাইফ ইনসিওরেন্স, প্রটেক্টিভ ইসলামী লাইফ ইনসিওরেন্স, স্বদেশ লাইফ ইনসিওরেন্স, ট্রাস্ট ইসলামী লাইফ ইনসিওরেন্স, আস্থা লাইফ ইনসিওরেন্স, সোনালী লাইফ ইনসিওরেন্স, আলফা ইসলামী লাইফ ইনসিওরেন্স, বেস্ট লাইফ ইনসিওরেন্স, চার্টার্ড লাইফ ইনসিওরেন্স, গোল্ডেন লাইফ ইনসিওরেন্স, যমুনা লাইফ ইনসিওরেন্স এবং মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফ ইনসিওরেন্স ।

বিমা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মূলত ছয় কারণে এমন সংকট তৈরি হয়েছে। সেগুলো হলো, দীর্ঘদিন ধরেই বিমা খাতে আস্থার ঘাটতি আছে। ফলে মেধাবী ও দক্ষরা তুলনামূলকভাবে এ খাতের দিকে আগ্রহী হয় না। এ খাতের সঙ্গে যারা জড়িত তারাও বিমা খাতের চাকরিকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারেননি। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই এ খাতে যোগ্য লোক নিয়োগ হয়নি। দ্বিতীয়ত, যারা সিইও হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পরে চুক্তি নবায়ন করতে পারেন না। তাদের দক্ষতা কম থাকা এবং মালিকপক্ষের মনোপুত কাজ না করার কারণে এমনটা হয়ে থাকে। আবার নতুন করে নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রেও কোম্পানির মালিকরা এমন ব্যক্তিকে খোঁজেন যিনি কোম্পানির পরিচালকদের ‘পারপাস সার্ভ’ করতে পারেন। এছাড়া ইনসিওরেন্স কোম্পানির মালিকদের আঞ্চলিকপ্রীতিও দেখা যায়। যোগ্য লোক হওয়ার পরও একটি বিশেষ অঞ্চলে বাড়ি নয় বলে তাকে সিইও হিসেবে নিয়োগ দেয় না অনেক কোম্পানি। তৃতীয়ত, বিমা খাতে যারা চাকরি করেন তাদের প্রশিক্ষণের যথেষ্ট অভাব থেকে যায়। ফলে যেভাবে যোগ্য হওয়ার দরকার সেভাবে তারা গড়ে উঠতে পারেন না। এক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতনরা তাদের অধস্তনদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে পারেন না। চতুর্থত, মালিকপক্ষের অতি মুনাফালোভীর মানসিকতা। এ কারণে কোম্পানির জন্য এমন সিইও খোঁজেন যে, যিনি রাতারাতি লোকসানি কোম্পানিকে লাভজনক এবং কম লাভের কোম্পানিকে বেশি লাভের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পারেন। পঞ্চমত, বিমা কোম্পানির মালিক বা পরিচালকদের বেশির ভাগই রাজনৈতিক নেতা বা তা তার আত্মীয়স্বজন। আবার কেউ বা অন্য ব্যবসায়ী। ফলে অনেক পরিচালকের এ বিষয়ে তেমন কোনো জ্ঞান নেই আবার যাদের জ্ঞান আছে তারা কোম্পানিতে সময় দিতে পারেন না। ষষ্ঠত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আইডিআরএ বিমা খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে বা যোগ্য লোক তৈরি করতে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারছে না। অবশ্য আইডিআরএ বলছে, বিমা খাতকে আগের চেয়ে ভালো অবস্থানে নিয়ে এসেছে আইডিআরএ। লোকবল সংকটের কারণে যতটুকু করা দরকার তা করা যাচ্ছে না।

আইন অনুযায়ী, বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার পদ তিন মাসের বেশি খালি রাখা যাবে না। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) অনুমোদন দিলে সিইও নিয়োগের জন্য আরো তিন মাস সময় পাওয়া যাবে। সবমিলিয়ে ছয় মাসের বেশি সিইও পদ খালি রাখার সুযোগ নেই। কোনো কোম্পানিতে সিইও পদ ছয় মাস শূন্য থাকলে প্রশাসক নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে বিমা আইনে। তবে কোনো কোনো কোম্পানিতে সাত বছরও নিয়মিত সিইও নেই বলে দেখা গেছে। ২০১৩ সালের জুলাই মাসে অনুমোদন পাওয়ার পর থেকেই মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ছাড়া চলছে চার্টার্ড লাইফ ইনসিওরেন্স। এরআরবি গ্লোবাল লাইফে নিয়মিত সিইও নেই ২০১৭ সাল থেকে। চলতি বছরের মার্চ থেকে সিইও নেই ট্রাস্ট ইসলামী লাইফে। চলতি বছরের জুনে ন্যাশনাল লাইফের সিইও জামাল এম এ নাসের মহামারি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ২০ জুলাইতে মারা যান মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফের সিইও বোরহান উদ্দিন মজুমদার। এরপর থেকেই পদটি শূন্য রয়েছে।

পদ্মা ইসলামী লাইফের সিইও নেই ২০১৯ সালের মে মাস থেকে। সানলাইফে চলতি বছরের জুন থেকে সিইও নেই। আলফা ইসলামী লাইফে সিইও নেই ২০১৯ সালের আগস্ট থেকে। গোল্ডেন লাইফের সিইও নেই চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে। স্বদেশ লাইফে সিইও নেই ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে। চলতি বছরের মার্চ থেকে শূন্য রয়েছে সানফ্লাওয়ার লাইফের সিইও পদ। বেস্ট লাইফে সিইও নেই ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে। আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠান আস্থা লাইফ ইন্স্যুরেন্স চলতি বছরের ২৩ জুন থেকে কার্যক্রম শুরু করলেও এখন পর্যন্ত সিইও নেই। যমুনা লাইফে সিইও নেই চলতি বছরের এপ্রিল থেকে। সোনালী লাইফ ও প্রোটেক্টিভ ইসলামী লাইফে নিয়মিত সিইও নেই চলতি বছরের জুন থেকে।