শাহাদাত স্বাধীন
লেবাননের বৈরুত বন্দরে থাকা ২৭৫০ টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের বিস্ফোরণে তছনছ হয়ে গেছে বৈরুত। দীর্ঘ সময় ধরে গৃহযুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিপর্যস্ত ছোট দেশ লেবাননের সামনে এই বিস্ফোরণ বড় ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে এসেছে।
এই বিস্ফোরণের ফলে ১৫৪ জন নিহত, ৫ হাজার আহত ও ৩ লাখ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে বলা হচ্ছে। ১০০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা করছে অর্থনীতিবিদরা; কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষতির আলোচনার চেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে সম্ভাব্য রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। বিস্ফোরণের পর প্রথম বিদেশি অতিথি হিসেবে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ লেবানন সফর করেন। তিনি সফরে গিয়ে লেবানন সরকারকে রাজনৈতিক সংস্কারের নির্দেশ দেন। তার সফরের সময় সরকারের প্রতি ক্ষোভ জানিয়ে ফ্রান্সকে আগামী ১০ বছরের জন্য লেবাননের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে কিছু প্রতিবাদকারী। এই বিষয়ে ইতিমধ্যে একটি অনলাইন পিটিশনে ৫৫ হাজার লোক স্বাক্ষর করেছে।
ফলে এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—সাবেক উপনিবেশ ফ্রান্স কি ফের লেবাননের নিয়ন্ত্রণ নেবে! ফ্রান্স রাজনৈতিকভাবে ও অর্থনৈতিকভাবে লেবাননে বেশ শক্তিশালী। ২০১৮ সালে ফ্রান্স লেবাননে রপ্তানি করেছে ৯০০ মিলিয়ন ডলার আর আমদানি করেছে ৬৩ মিলিয়ন ডলার। এযাবত্কালে লেবানন নিয়ে হওয়া সবকয়টি দাতা সম্মেলন নিয়ন্ত্রণ করেছে ফ্রান্স। দাতারা প্রতিশ্রুতি দিলেও হিজবুল্লাহর সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক থাকার অভিযোগে শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুত অর্থ দেয় না।
লেবানন ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণে যায় ১৯১৬ সালের ‘সাইকেস পিকট’ নামক গোপন চুক্তির মাধ্যমে। ১৯৪৩ সালে স্বাধীনতা পেলেও লেবানন থেকে যায় নানা দেশের প্রক্সির যুদ্ধের স্থান। ১৯৮৩ সালে হরকাতুল জিহাদের বোমা হামলায় ফ্রান্স-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক বাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত হলে তারা লেবানন ত্যাগ করে; কিন্তু চলমান গৃহযুদ্ধ থামেনি। যে গৃহযুদ্ধের একটি পক্ষ দক্ষিণীয় লেবানন আর্মির সহযোগী ছিল ইসরাইল। গৃহযুদ্ধ থামাতে তত্কালীন সাদ্দামবিরোধী পক্ষ সৌদি, মিশর, সিরিয়া, ইরান, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র ১৯৮৯ সালে লেবানন নিয়ে ‘তায়েফ চুক্তি’ তৈরি করেন।
সাবেক উপনিবেশ ফ্রান্সের পাশাপাশি সৌদি আরব আর ইরান লেবাননের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। ২০১৭ সালে হঠাত্ করে রফিক হারিরির ছেলে সা’দ হারিরি সৌদি আরবে একটি টিভি চ্যানেলে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। মূলত ইরান ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক রাখার অভিযোগে সৌদির চাপে তাকে পদত্যাগ করতে হয়; কিন্তু ঘটনায় হস্তক্ষেপ করে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট সা’দ হারিরিকে আশ্রয় দেন প্যারিসে। এই হস্তক্ষেপ মূলত লেবানন নিয়ে সৌদি ও ইরানের প্রভাব রুখে দেওয়ার চেষ্টা ফ্রান্সের। সাম্প্রতিক বিস্ফোরণ ফ্রান্সকে সে প্রভাব রুখে দেওয়ার সুযোগ হিসেবে এসেছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট লেবাননে যে ভাষায় কথা বলে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারব্যবস্থার কেন্দ্রীয় সরকারও রাজ্য সরকারকে এই ভাষায় নির্দেশ দেয় না।
তবে লেবাননের রাজনীতিতে ইসরাইল এবং ইরানপন্থি হিজবুল্লাহও প্রভাবশালী। ২০০৬ সালে ইসরাইলের আধুনিক প্রযুক্তির সেনাবাহিনীকে হিজবুল্লাহ গেরিলারা লেবানন সীমান্তের নাস্তানুবাদ করে দেয়। আফগানিস্তানের তালেবানের মতো সরকারে না থেকে দেশের অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করে হিজবুল্লাহরা। ইসরাইল তার নিরাপত্তার জন্য পার্শ্ববর্তী দেশ জর্ডান, মিশর, সিরিয়া ও লেবাননে অনুগত সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মিশরে সেটা সম্ভব হয়েছে। সিরিয়ায় প্রচেষ্টা চলছে। এখন দৃষ্টি লেবাননে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইয়ের মতে, হিজবুল্লাহ বৈরুত সমুদ্রবন্দর দিয়ে অস্ত্র আমদানি করে ফিলিস্তিনিযোদ্ধা ও সিরিয়ার শাসককে সরবরাহ করে। বৈরুত বন্দর ইসরাইলের হাইফা বন্দরের প্রতিদ্বন্দ্বী। ফলে এই বন্দর আদৌ সংস্কার হবে কি না—তা নিয়ে আশঙ্কা থেকে যায়। বিস্ফোরণের পর প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পেয়ে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী মিশেল উন ইসরাইলের সঙ্গে শান্তি আলোচনা ও জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের কথা বলছেন। তবে সে সরকারে হিজবুল্লাহকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা থাকবে ফ্রান্স-ইসরাইলের। অন্যদিকে ইরান ও সিরিয়ার আসাদ সরকারের জন্য ইসরাইল সীমান্তে হিজবুল্লাহকে বাঁচিয়ে রাখা জরুরি।
তবে লেবানিজরা সংস্কার চায়। লেবাননের ৮০ শতাংশ অর্থ কালো বাজারে। বেকারত্ব ছুঁয়েছে ৫০ শতাংশে। গতবছর থেকে চলা ‘অক্টোবরবিপ্লব’ আন্দোলনকারীরা নাজুক পরিস্থিতির জন্য সরকারের দুর্নীতি ও ধর্মভিত্তিক কোয়ালিশনকে দায়ী করছেন। এই বিস্ফোরণ সংস্কারের দাবিকে গতি দিয়েছে; কিন্তু সে সংস্কার লেবাননের স্বার্থে না হয়ে ইসরাইল ও ফ্রান্সের স্বার্থে হলে লেবাননে ফের গৃহযুদ্ধ ও প্রক্সিযুদ্ধের স্থান হয়ে উঠতে পারে।
n লেখক : শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
