অবৈধ গ্যাস-সংযোগের মহোত্সব

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২০, ২২:০২

সাভারে অবৈধ সংযোগের কারণে বৈধ লাইনে গ্যাসের চাপ কম

তুহিন খান

করোনা ভাইরাসের মহামারির মধ্যেও সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে থেমে নেই অবৈধ গ্যাস-সংযোগের মহোত্সব। বিভিন্ন এলাকায় দিনে ও রাতের আঁধারে পাল্লা দিয়ে অবৈধ গ্যাস-সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। এসব অবৈধ গ্যাস-সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও কয়েক দিনের মধ্যেই তা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। আর এ অবৈধ গ্যাস-সংযোগকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী মহল কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অপরদিকে ত্রুটিপূর্ণ ও নিম্নমানের এসব অবৈধ গ্যাসপাইপের সংযোগ থেকে প্রায়ই ঘটছে দুূর্ঘটনা। সম্প্রতি গ্যাস বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে বেশ কয়েক জনের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। অবৈধ গ্যাস-সংযোগের চাপে গ্যাস পাচ্ছে না বৈধ গ্যাস-সংযোগকারীরা। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানায় উত্পাদনও ব্যাহত হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাভারের গেন্ডা, রাজাশন, সিটিলেন, উলাইল, কর্ণপাড়া, হেমায়েতপুর, আশুলিয়ার কবিরপুর, বারৈপাড়া, জিরানী, শ্রীপুর, বাইপাইল, বুড়িরবাজার, ডেন্ডাবর, পল্লীবিদ্যুত্, শ্রীখণ্ডিয়া, গাজীরচট, জামগড়া, বেরন, নিশ্চিন্তপুর, ঘোষবাগ, নরসিংহপুর, জিরাব, ইয়ারপুর, টঙ্গাবাড়ী, দুর্গাপুর ও কাঠগড়াসহ আশুলিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতে ও সাভার পৌর এলাকাসহ গোটা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে অবৈধভাবে গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব অবৈধ গ্যাস-সংযোগে কতিপয় ঠিকাদার ও স্থানীয় দালালরা প্রতিটি বাড়ির মালিকের কাছ থেকে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তবে অবৈধভাবে এসব গ্যাস-সংযোগে কিছু প্রভাবশালী নেতাকর্মীও জড়িত বলে সাভার তিতাস গ্যাস সূত্রে জানা গেছে ।

একাধিক কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রয়োজনের অর্ধেক গ্যাসও পাচ্ছে না শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। গ্যাসসংকটের কারণে একটি মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে মাসে বিপুল অঙ্কের টাকা বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। গ্যাস জেনারেটর থাকা শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক যন্ত্রপাতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে গত শুক্রবার সাভারের নামা গেন্ডা ও জাদুরচর এলাকার কয়েকটি কারখানার অবৈধ গ্যাস-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সাভার তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড কর্তৃপক্ষ।

অপরদিকে অবৈধ এসব সংযোগ থেকে বিভিন্ন স্থানে মাঝে মধ্যেই অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। পুড়ে গেছে বসতবাড়িসহ লক্ষাধিক টাকার মালামাল। গত ৫ জুলাই ভোরে আশুলিয়ার দুর্গাপুরের পূর্বচালা গ্রামের একটি বাড়িতে রান্না করার সময় গ্যাস-সংযোগের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে দগ্ধ হয়ে তিন জনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় সাত জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। ইতিপূর্বে বেরন এলাকার মনিকগঞ্জপাড়ার একটি দোতলা বাড়িতে গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকে পুরো বাড়িতে গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। সকালে রান্না করার জন্য আগুন ধরানোর চেষ্টা করতেই পুরো ঘরে আগুন লেগে যায়। এতে দগ্ধ হয় পাঁচ জন। আশুলিয়ার নরসিংহপুরে তিতাস গ্যাসের পাইপলাইনে বিস্ফোরণে এক নারীর মৃত্যু হয়। এতে দগ্ধ হন আরো বেশ কয়েক জন। সাভারে ভাগলপুরে গ্যাসলাইন বিস্ফোরণে স্বামী ও স্ত্রী নিহত হয়। এ ঘটনায় আরও পাঁচ জন অগ্নিদগ্ধ হয়। স্থানীয়রা জানান, বর্তমানে আবাসিক সংযোগ বন্ধ থাকলেও টাকার বিনিময়ে মিলে অবৈধ সংযোগ। তাদের অভিযোগ, তিতাসের কিছু অসাধু কর্মচারীর যোগসাজসে এসব অবৈধ সংযোগ প্রদান করা হয়েছে।

তিতাস গ্যাস অ্যান্ড ট্রান্সমিশন কোম্পানির সাভার এরিয়ার ডেপুটি ম্যানেজার আবদুুল মান্নান জানান, প্রায়ই অভিযান চালিয়ে অবৈধ গ্যাসলাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়। অবৈধভাবে গ্যাস-সংযোগকারীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও করা হয়েছে। এ ব্যাপারে প্রকৌশলী মো. আবু সাদাত্ মো. সায়েম জানান, অবৈধ গ্যাস-সংযোগকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। ইতিমধ্যে অনেক বিচ্ছিন্ন ও গ্যাসপাইপ জব্দ করা হয়েছে। অভিযান চলমান থাকবে।