করোনার প্রাধান্যে অবহেলায় অন্য রোগের চিকিৎসা

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২০, ০১:০৮

করোনাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে চিকিৎসায় অবহেলার শিকার হচ্ছে অসংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত লাখ লাখ রোগী। বর্তমানে বিশেষায়িত চিকিৎসাব্যবস্থা ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়ে এসেছে। করোনায় আক্রান্ত নয়, কিন্তু অন্য গুরুতর রোগ রয়েছে এমন রোগীরা জরুরি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং কঠিন এক সময় পার করছে। যারা নিয়মিত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিত, তারা এখন ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে না।

 

করোনা আসার পর থেকে বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হাসপাতালে যান না। প্রাইভেট প্র্যাকটিসও বন্ধ রেখেছেন অনেকে। এতে অসংক্রামক রোগীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে ক্যানসার, কিডনি, হার্ট, লিভার, নিউরোলজি, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্তদের অনেকে চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাচ্ছে।


 
শত অনুনয়েও করোনার টেস্ট ছাড়া ভর্তি করছে না কেউ, মুমূর্ষু রোগী নিয়ে অসহায় স্বজনেরা ছুটছেন এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে? একপর্যায়ে বিনা চিকিত্সায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে রোগী? তাদের মৃত্যুর কারণ কিন্তু করোনা ভাইরাস নয়? বাংলাদেশে প্রথম করোনা ভাইরাস সংক্রমণ শনাক্তের পর গত সাত মাসে অনেকে এভাবে বিনা চিকিত্সায় মারা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে? হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, করোনার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বিনা চিকিত্সায় মারা গেছে কিডনি, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, লিভার, হৃদরোগসহ অসংক্রামক রোগে আক্রান্তরা। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বজন হারানোর বেদনার কথা তুলে ধরেছেন, প্রকাশ করেছেন ক্ষোভ? কিছু মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমে উঠে এসেছে? কিছু মৃত্যু আড়ালেই রয়ে যাচ্ছে? অথচ এর আগে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর থেকে সব ধরনের রোগীর চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত করতে দেশের সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালে নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে কোনো নির্দেশনা কাজে আসছে না। দীর্ঘদিনের পরিচিত রোগীরাও সেবা নিতে পারছে না। অনেক হাসপাতাল থেকে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা মুঠোফোন আলাপেই রোগীদের হাসপাতালে আসতে নিষেধ করছেন।

ভুক্তভোগীদের বিস্তর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানীর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল-মিটফোর্ট, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, কিডনি ইনস্টিটিউট, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ক্যানসার ইনস্টিটিউট, নিউরো সায়েন্স ইনস্টিটিউট, পঙ্গু হাসপাতাল ও বক্ষব্যাধী হাসপাতালে ঘুরে এমন সব চিত্রই উঠে এসেছে। কোনো কোনো হাসপাতালের পরিচালকেরা বলেন, মধ্যম বয়সী, কনসালটেন্ট, জুনিয়র কনসালটেন্ট ও রেজিস্ট্রাররা হাসপাতালে কম আসেন। কোনো কোনো পরিচালক বলেন, জুনিয়র চিকিত্সকেরা নিয়মিত চিকিত্সা দিয়ে যাচ্ছেন, তবে অধ্যাপকদের অনুপস্থিতি বেশি। আবার কোনো কোনো হাসপাতালের প্রফেসররা আসেন না। ফোনে কথা বলেন। আবার কেউ কেউ এসেই চলে যান। একটি হাসপাতালের পরিচালক বলেন, তার নিজের হাসপাতালের এক উপপরিচালক ও স্বাচিপের নেতা অফিসে আসেনই না। কেনাকাটাসহ বিভিন্ন তদবির নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। শুধু তিনটি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক সপ্তাহে এক দিন আসেন, আবার কেউ আসেন না। জুনিয়র চিকিত্সকেরা বলেন, ‘স্যাররা আসেন না, কী করব? আমরা সেবা দিচ্ছি। স্যাররা ফোনে কথা বলেন।’

বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. ওবায়দুল্লাহ বাকী বলেন, এমনিতে ক্যানসার রোগীদের চাহিদা অনুযায়ী চিকিত্সাব্যবস্থা সীমিত। করোনার কারণে ডাক্তাররা আসেন না। বেশির ভাগ ক্যানসার রোগী সুচিকিত্সার অভাবে মারা যাচ্ছে। সোসাইটি অব রেডিয়েশন অনকোলজিস্টদের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, করোনার কারণে অসংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীরা চিকিত্সাসেবা পাচ্ছে না। কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক হারুন-উর-রশিদ বলেন, ২ কোটি মানুষ কিডনির জটিলতায় ভুগছে। এর মধ্যে ২৫ ভাগ ডায়ালাইসিসসহ চিকিত্সাসেবা নিতে পারে। বাকি ৭৫ ভাগই চিকিত্সার বাইরে থাকে। দারিদ্র্যের কারণে তারা চিকিত্সা করাতে পারে না। করোনার কারণে এখন চিকিত্সায় বেহাল অবস্থা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ডাক্তাররা আসেন না। প্রাইভেট প্র্যাকটিসও অনেকে বন্ধ রেখেছেন। আগে বছরে ২০০ কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট হতো। এখন শুধু শ্যামলীতে একটি বেসরকারি হাসপাতালে সীমিত অবস্থায় কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট চালু আছে।

অনেক হাসপাতাল থেকে এনেসথেসিওলজিস্টদের কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এতে অপারেশন ব্যাহত হচ্ছে। পঙ্গু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবদুল গণি মোল্লা বলেন, পঙ্গু হাসপাতাল থেকে ১৫ জন অজ্ঞানকারী চিকিত্সককে কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এতে পঙ্গু হাসপাতালে অপারেশন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। সোসাইটি অব এনেসথেসিওলজিস্টের সভাপতি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এনেসথেসিওলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. দেবব্রত বণিক বলেন, আইসিইউ হলো করোনা ভাইরাস ছড়ানোর কারখানা। একটা রোগীর সঙ্গে ছয় থেকে সাত জন লোক আসেন। কিছু ওষুধও বাইরে থেকে আনানো হয়। এসব নানাবিধ কারণে এনেসথেসিওলজিস্টরা চরম ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন। অজ্ঞানকারী চিকিত্সাসেবা অব্যবস্থাপনার মধ্যে চলছে। করোনা সামাল দিতে গিয়ে অন্যান্য বিষয়ে সংকটাপন্ন রোগীদের আইসিইউতে বেড দেওয়া সম্ভব হয়নি কিংবা ভর্তি হলেও তাদের এনেসথেসিয়া ডাক্তারদের অভাবে চিকিত্সাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে অক্সিজেন ব্যবস্থা উন্নতি হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযোগিতায়। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সহযোগিতা করা হচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগে অধিদপ্তর ভালো কাজও করত, খারাপ কাজও করত। বর্তমানে কাজে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। এদিকে কোনো কোনো হাসপাতালের পরিচালকরা স্বীকার করেন, সিনিয়র ডাক্তাররা কাজে ফাঁকি দিচ্ছেন। কারণ ডাক্তাররা করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন, মারাও যাচ্ছেন। এ কারণে ভয় পাচ্ছেন। তবে রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের পরিচালক নিউরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ ও যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. বদরুল আলম নিয়মিত অফিস করছেন। গতকালও তারা প্রায় ৭০০ রোগী দেখেছেন।


ইত্তেফাক/ইউবি