হেরডারলিন উন্মাদ হ’য়ে বেঁচেছিলেন সাঁইতিরিশ বছর (১৮০৬-১৮৪৩); নজরুল পঁয়তিরিশ বছর (১৯৪২-১৯৭৬)। পৃথিবীর সাহিত্যতিহাসে এই দুই ভিনদেশি ও মেরু-দূর স্বভাবের কবি এই এক জায়গায় এক আশ্চর্য উদাহরণ হ’য়ে আছেন। হ্যাঁ, স্বভাবে কত সুদূর দুজন : জর্মান কবিতে আছে গ্রিসিয় শান্ততা ও সৌষম্য, সুমিতি ও ভারসাম্য; আপাতভাবে তাঁর চরিত্রে এমন কিছু নেই, যা আগুন ধরিয়ে দিতে পারে এই শরীর-মনের খড়ের বাড়িটায়। আর আমাদের বাঙালি কবিটি তো উচ্চকণ্ঠ, হুইটম্যান-কথিত ‘multitudes’-কে ধারণ করেন একটি আধারে, এক গহন মজনু তাকে করেছে উতরোল ও উচ্চরোল, তাঁর এরকম পরিণতি খুব অস্বাভাবিক মনে হয় না। একবার অসুস্থ হ’য়ে পড়ার পর আর তাঁরা স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাননি। দীর্ঘকাল অসুস্থ হ’য়ে তারই ভিতরে চ’লে গেছেন মৃত্যুর কবলে। দুজনেই ছিলেন ‘নিরীহ পাগল’। হেরডারলিন অস্পষ্ট হ’লেও কথা বলতে পারতেন, অন্তত অসংলগ্ন কবিতা লিখতেন, নিজের নাম অবশ্য ভুলে গিয়েছিলেন তিনি। আর নজরুল তো একেবারে বাকশক্তিহীন, লিখনশক্তিহীন। হেরডারলিন অসুস্থ হ’লেও পিআনো বাজাতে পারতেন। নজরুল একমাত্র স্বরচিত গান শুনে সুদূর ও অস্পষ্টভাবে চঞ্চল হ’য়ে ওঠেন, সাড়া দ্যান, তাঁর ভিতরকার কোনো শিল্পের পাতায় এক-ফোঁটা জল পড়ে, ন’ড়ে ওঠে শিল্পের পাতা, নড়ে উঠে স্তব্ধ হ’য়ে যায়।
আর-একরকম নীরবতা আছে, যার সঙ্গে এর যোজন ফারাক: কবিশিল্পীরা যা কখনো-কখনো নিজের জন্যে তৈরি ক’রে নেন। তফাতটা ওখানেই: হেরডারলিন বা নজরুলের কণ্ঠের উপরে নীরবতা-ছুরি নেমে এসেছিল। আর ভালেরি বা সুধীন্দ্রনাথ নিজের জন্যে বানিয়ে নিয়েছিলেন নৈঃশব্দ্যের গম্বুজ। একটি যদি হয় অচিকিত্স্য প্রাকৃতিক বিধান, তবে অন্যটি স্বযাচিত চিকিত্সা ও আত্মশোধন। ভালেরি ঐ কবিতৃরিক্ত দু’ দশক ধ’রে চর্চা করেছেন গণিতের আর সুধীন্দ্রনাথের নীরবতার তাত্পর্য-বিদ্যুত্ চিহ্নিত ক’রে দিয়েছিলেন তাঁর সমকালীন একজন কবি, জীবনানন্দ দাশ : ‘সুধীন্দ্রনাথ আজকাল কবিতা লেখা একদম ছেড়ে দিয়েছেন। এই কবির প্রতিভা এবং আন্তরিকতা এঁর নিজের জিনিস। আর কিছু জানাবার নেই মেনে হয়তো তিনি আত্মজিজ্ঞাসায় চুপ হয়ে আছেন। এরকম আত্মপ্রসাদহীন সংযম দেশি-বিদেশি খুব কম লেখকের বেলাই দেখা যায়।’ দীর্ঘ নীরবতার পর ফিরে-আসা ভালেরি ও সুধীন্দ্রনাথ তাঁদের আপনাপন কবিতায় নূতন পরিধি নির্মাণ করেছিলেন। জীবনানন্দপ্রোক্ত ‘আত্মজিজ্ঞাসায় চুপ’ শব্দবন্ধটি লক্ষণীয় : সুধীন্দ্রনাথ বা ভালেরি-র নীরবতা সচেতন ও স্বচেতন। নজরুলের উপরে লেখা একটি নিবন্ধে জীবনানন্দের এই ভরসা ছিল এঁদের মতো নজরুল হয়তো পুনর্সুস্থ হয়ে সাহিত্যে ফিরে আসবেন আবার : ‘রোগমুক্তির পর নজরুল এই বিষয়ে অবহিত হ’য়ে উঠবেন আশা করি।’ না, নজরুল সুস্থ হ’য়ে সাহিত্যে প্রত্যাবর্তন করেননি আর, সুধীন্দ্রনাথ বা ভালেরি নন তিনি, তাঁর নিয়তি আলাদা, তাঁর নীরবতাও পৃথক তাত্পর্যে গরীয়ান।
তাঁর নীরব হ’য়ে যাওয়ার এক যুগ আগে (১৯২৯ সালে) কবির স্বজ্ঞাই কি কবিকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিল এই ক’টি ভবিষ্য-চরণ?—
তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু, আর আমি জাগিব না।
কোলাহল করি’ সারা দিনমান কারো ধ্যান ভাঙিব না।
—নিশ্চল নিশ্চুপ
আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধবিধুর ধূপ।—
[বাতায়ন-পাশে গুবাক-তরুর সারি]
আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘নজরুল ইসলাম কবি ও কবিতা’
(নজরুল একাডেমী, ১৯৭৭) বই থেকে
