সুরক্ষাসামগ্রী অতি ব্যবহারে কত ক্ষতি?

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২০, ২১:৩০

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম

কয়েক বছর আগে থেকে বাসার পাশের সংযোগ নালাগুলোতে মশার লার্ভা খেয়ে ফেলার জন্য তেলাপিয়া ও টাকি মাছ ছেড়ে তাদের বংশ বিস্তার করা হয়েছিল। তেলাপিয়া বড় হয়ে ভেসে থাকত, মৌসুমি চ্যাং, খলশে, ডানকানা ইত্যাদি মাছের সঙ্গে বাদামি ব্যাং ও নানা জলজ পোকামাকড় চোখে পড়ত সেখানে। এলাকার ডানপিটে বাচ্চারা ভেসে থাকা মাছ দেখতে পেয়ে ছোট ছোট ছিপ নিয়ে ভিড় জমিয়ে আনন্দ-ফুর্তি করে সে সব মাছ ধরে নিয়ে যেত। বিশেষ করে জ্যান্ত চ্যাং মাছ ও বাদামি ছোট ব্যাঙের বেশ কদর। বড় মাছ ধরার টোপ হিসেবে বেশ দাম দিয়ে সেগুলো বিক্রি হতো। কারণ, সেগুলো দিয়ে নদীতে সৌখিন মত্স্য শিকারিরা রাঘববোয়াল, গজার প্রভৃতি বড় বড় রাক্ষুসে মাছ শিকার করে থাকে। 

আমাদের এলাকাটা নিরিবিলি হওয়ায় করোনার স্বাস্থ্যবিধি নিয়ন্ত্রিত সময়েও পাশের রাস্তাগুলো হাঁটাচলা করার জন্য বেশ উপযুক্ত। এবারের বর্ষায় বৃষ্টির পরিমাণ বেশি। নালাগুলোতে পানি ভর্তি। তবে কচুগাছ, আগাছা প্রভৃতি জন্মেছে। প্রতি বছরের মতো পাড়ার ছোট ছেলেরা ছিপ নিয়ে মাছ ধরতে ভিড় করতে আসছে না। এক রোদেলা বিকালে হঠাত্ ওদের দুই জনের সঙ্গে দেখা হলো। ছিপ নিয়ে এদিক সেদিক যাচ্ছে ও নিজেরা কথা বলছে। ওদের চোখে আগের মতো সেই আনন্দ নেই। হাতে মাছ রাখার থলে দেখতে চাইলে বলল—স্যার এবার নালাগুলোতে মাছ নেই। অনেক পানি, দেখতে টলটলে। মাছ, ব্যাং, বক, কিছুই নেই কেন?

হাঁটতে হাঁটতে ওদের কথায় সাড়া দিতে দিতে ভাবলাম দেখিতো বিষয়টা কী?

হ্যাঁ, নালার পানি দেখতে বেশ পরিষ্কার। তবে পানির ওপরে এক ধরনের স্তর পড়েছে। সাবান, ডিটারজেন্টের মতো একটা ঘ্রাণ বোঝা যাচ্ছে। ফিরতে ফিরতে লক্ষ্য করলাম, বাসার পাশের ড্রেনটাতে আগের মতো মাছি, মশা, ব্যাং—কিছুই নেই।

কয়দিন ধরে এক ডাহুক-দম্পতিকে ছোট কালো ছানা সঙ্গে নিয়ে বাসার ভেতরের বাগানে বিচরণ করতে দেখছি। তাহলে কি ওরা বাইরে স্বাভাবিক খাবারের অভাবে বাগানে খাদ্য খুঁজতে আসে?। হয়তো বা তাই।

মাঝেমধ্যে মনে হয়, করোনার সময়ে বনের বড় বড় প্রাণী বাইরে বের হয়ে লোকালয়ে ভিড় করছে খাদ্যের জন্য। পত্রিকায় এসেছে—বিভিন্ন দেশে এই প্রবণতা দেখা গেছে। বাড়ির কাছের ছোট জলজ প্রাণী তাহলে ভিন্ন এক সংকটে নিপতিত?

তাই হতে পারে। করোনায় দৈনন্দিন স্বাস্থ্যবিধি মানতে গিয়ে আমরা সবাই কয়েক বার হাত ধুচ্ছি? বেশি বেশি সতর্কতা অবলম্বন করতে গিয়ে বহুবার সাবান, ডিটারজেন্ট ব্যবহার করে চলেছি। সঙ্গে নানা ব্র্যান্ডের জীবাণুনাশক স্প্রে ঘরে-বাইরে ছিটানো হচ্ছে হরদম।

সব জীবাণু ক্ষতিকর বা প্রাণ হরণকারী নয়। প্রাণীদেহের জন্য অনেক উপকারী জীবাণু তথা ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস রয়েছে। অথচ আমরা করোনার জন্য অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে গিয়ে প্রাণরক্ষাকারী বহু জীবাণুকে ধ্বংস করে চলেছি। পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত, মানহীন ও মাত্রাতিরিক্ত সাবান ও অন্যান্য জীবাণুনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নিজের ও পরিবেশের ক্ষতি করে চলেছি।

তাহলে এই ছোট্ট অদৃশ্য অণুজীবের সামান্য কাহিনি মোকাবিলার জন্য মানুষের শক্তি কি এতটাই সীমিত? কোভিড-১৯ নির্মূলের একটি কার্যকরী টিকা আবিষ্কার করতেই মানুষের গলদঘর্ম অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এজন্য দেশে দেশে কর্তৃপক্ষগুলোর ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া বড়ই বিশৃঙ্খল প্রতীয়মান হচ্ছে। করোনা আগামী শীতে দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় ঢেউ ছড়ানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ অনেক দেশের গণস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে শীতকাল শুরু হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে বলে জানা গেছে। করোনা প্রতিরোধের জন্য যেসব জীবাণুনাশক দ্রব্য, ওষুধ ও উপায় ব্যবহার করা হচ্ছে তা আরো কতদিন ব্যবহার করতে হবে তা কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না। এগুলো দীর্ঘসময় ধরে অতি ব্যবহারে কত ক্ষতি হবে সে সম্পর্কে এক্ষুনি সতর্কতা অবলম্বন না করলে পৃথিবীতে আরেকটি ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে।

n লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান