নিভৃতচারী এক যোদ্ধা...

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২০, ২১:৩১

কামাল পাশা চৌধুরী

শিল্পী মুর্তজা বশীরকে সুনির্দিষ্ট একক অভিধায় ভূষিত করলে প্রকৃত অর্থে এই মহান মানুষটির প্রতি অবিচার করা হয়। মুর্তজা বশীরের প্রয়াণের পর নানা মহল, নানা মিডিয়া বিভিন্নভাবে তাকে উপস্থাপন করছেন। সব মিলিয়ে সেখানে প্রকৃত মুর্তজা বশিরকে উদ্ধার করা একটি কষ্টসাধ্য কাজ। মুর্তজা বশীরের জীবন ও কর্ম ছিল প্রকৃত অর্থেই খুব বিচিত্র ও ঘটনাবহুল। শিল্পকলা সৃষ্টির জন্য তিনি নানা মাধ্যমে বিচিত্র ফর্ম নিয়ে যেমন খেলা করেছেন, বারবার পরিবর্তন এনেছেন রঙের প্রয়োগে, ফর্মের বিন্যাসে, তেমনি নিজের জীবন নিয়েও আমৃত্যু করেছেন বহুবিধ নিরীক্ষা, যার ফলে দেখা যায় তার শিল্পধারার মতো কর্মজীবনও নানামুখী বাঁক নিয়েছে বারবার। তাই মুর্তজা বশীরের পরিচয় কখনো সংগ্রাহক, কখনো গবেষক, কখনো প্রতিবাদী যোদ্ধা। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে তিনি একজন শিল্পী এবং মুখ্য অর্থে শিল্পীই। দেশপ্রেম এবং সামাজিক সচেতনতা পৃথিবীর যে কোনো দেশের চেয়ে বাংলাদেশের শিল্পীদের মধ্যে সবসময়ই অধিক পরিলক্ষিত হয়। এর অন্তর্নিহিত নানা কারণও আছে। মুর্তজা বশীরের ক্ষেত্রে এই চেতনা অনেক বেশি পরস্ফুিট। তার প্রথম কারণ, তিনি ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত জ্ঞানতাপস ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর সন্তান, পারিবারিক ঐতিহ্য ও যোগসূত্র থেকেই অনেক প্রখ্যাত রাজনীতিক ও কবি দার্শনিকের সাহচর্য পেয়েছেন তিনি, তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু, বিপ্লবী অম্বিকা চক্রবর্তীর অটোগ্রাফ সংগ্রহ করেছেন, কমিউনিস্ট নেতা ভবানী সেন, দার্শনিক রাধাকৃষ্ণ, রামনাথ বিশ্বাসেরও সংস্পর্শে এসেছেন, তাদের কর্মনিষ্ঠা চিন্তা এই শিল্পীর মননে যথেষ্ট প্ররোচনা যুগিয়েছে। তবে তাকে প্রথম যৌবনেই অধিক তাড়িত করেছে যে ঘটনা তাহলো ছাত্রজীবনের সূচনালগ্নে বগুড়ায় ভাষা আন্দোলনের মিছিল করার কারণে গ্রেফতার হওয়া এবং প্রায় পাঁচ মাস কারাবরণ করা। এ সময়ই তিনি ছাত্র ফেডারেশনের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হন। পরে ’৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় সশরীরে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার ঘটনা তাকে আজীবনের জন্য সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার দীক্ষা দেয়। ঢাকা ফাইন আর্ট ইনস্টিটিউট (বর্তমান চারুকলা অনুষদ)-এর দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র হিসেবে শিল্প অধ্যায়ন শুরু করেন। সেখান থেকে পাশ করে কিছুদিন কলকাতা কাটিয়ে উচ্চতর শিক্ষার জন্য ইতালির ফ্লোরেন্স যান। ফ্লোরেন্সে ‘একাদেমিয়া দ্যা বেল্লি’তে চিত্রকলা ও ফ্রেস্কো নিয়ে দুই বছর পড়াশোনা করেন। তখন তিনি রেনেসাঁর ধ্রুপদী ধারায় আকৃষ্ট থাকলেও কিছুদিনের মধ্যে তার শিক্ষক প্রখ্যাত শিল্পী অধ্যাপক কাপুচিনি তার চিন্তায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেন। ফলে ফিগার অঙ্কনে সিমপ্লিফিকেশন আর মিনিমাল কালারের প্রয়োগ বশীরের চিত্রকলাকে এক নতুন রূপ দেয়। তার আঁকা ‘প্রসাধনরত নারী’ আর ফ্লোরেন্সের ‘লা পার্মানেন্টো’ গ্যালারিতে করা প্রদর্শনীর ছবিগুলোতে এই প্রভাব সুস্পষ্টভাবে চোখে পড়ে।

মুর্তজা বশীর একক ক্যানভাসের বদলে সিরিজ আঁকতে উত্সাহী ছিলেন বেশি। তাই দেখা যায়, দীর্ঘ অন্তর্ধানের পর একেকটি নতুন চিত্রমালা নিয়ে সগৌরবে মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছেন তিনি। ষাটের দশকের গোড়াতেই তিনি আঁকলেন তার মেটাফোরিক্যাল সিরিজ ‘লিজার্ড’। এছাড়াও তার সিরিজ চিত্রকলা ‘দেয়াল’ ও ‘ট্রান্সফারেন্সি’ যথেষ্ট আলোড়ন তুলেছিল সমকালীন শিল্প জগতে। তবে এদেশের চিত্রকলার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকার মতো তার যে সৃষ্টি তাহলো ‘এপিটাফ ফর মার্টিয়াস’ বা ‘শহিদের ফলক’ সিরিজটি। যুগে যুগে শিল্পীরা প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গকে চিত্রকলায় ফর্ম হিসেবে ব্যবহার করে, কিন্তু পাথর শুধু ভাস্কররাই ব্যবহার করেছে শিল্প নির্মাণে। বেলাভূমিতে ছড়িয়ে থাকা নুড়িপাথরের বিচিত্র ফর্মগুলোকে যে কতটা সার্থকরূপে চিত্রকলায় ব্যবহার করা যায় এটা দারুণ মুন্সিয়ানার সঙ্গে মুর্তজা বশীর আমাদেরকে প্রথম দেখিয়েছেন তার ‘এপিটাফ ফর মার্টিয়াস’ সিরিজে। এই সিরিজের ছবিগুলো বিমূর্ত আঙ্গিকের অত্যন্ত সমকালীন ও আধুনিক ধারার। আগের সিরিজগুলোর অস্বচ্ছ ও কম্প্যাক্ট রং ত্যাগ করে স্বচ্ছ ও বেসিক কালার এমনভাবে প্রয়োগ করেছেন শিল্পী যে, এর সামনে দাঁড়ালে ফর্মের সাবলিলতা ও রং স্নিগ্ধতা দর্শককে সহজাতভাবেই প্রণত করে মহান শহিদদের স্মৃতির প্রতি। মুর্তজা বশীর ছিলেন দেশের প্রথম কাতারের শিল্পী, কিন্তু সাধারণের আলোচনায় শিল্পী হিসেবে তার নাম কখনো তেমন আলোচিত হয়নি। তার কারণ সাময়িক জনপ্রিয়তার জন্য তিনি কখনো সমাজের সহজাত প্রবণতার সঙ্গে আপস করেননি। তিনি সর্বদাই ছিলেন সময়ের আগে হাঁটা যাত্রী। দর্শকের চাহিদার কথা চিন্তা করে কখনো রং-তুলি ধরেননি তিনি, নিজের অন্তর্গত আকুতিকেই তিনি সবসময় সৃষ্টিতে মূর্ত করেছেন সচেতন সিদ্ধান্তে। সফল শিল্পী হিসেবে মুর্তজা বশীর চিত্রকলায় প্রণীত দেশের প্রায় সবগুলো জাতীয় পুরস্কার লাভ করেছেন। কিন্তু তার বাইরেও তার বিচরণ ছিল সংস্কৃতির নানা শাখায়। তার সাহিত্যের অবদান ছিল যথেষ্ট শিল্পমানসম্পন্ন। চিত্রকলায় তিনি সমাজ সচেতনতার প্রতিভূ হলেও সাহিত্য সৃষ্টিতে ছিলেন সম্পূর্ণ রোমান্টিক। ঢাকার বাংলা চলচ্চিত্রের সূচনা লগ্নের কুশিলবদের তিনি ছিলেন একজন। বাংলাদেশের শিল্পজগতের বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন মুর্তজা বশীর। জীবনদর্শন আর শিল্পদর্শন ছিল যার সমমাত্রার। আজীবন গভীর নিষ্ঠায় শুধু সৃষ্টির প্রতি নিবেদিত থেকেই মুর্তজা বশীর নিজেকে নিঃশেষ করেছেন। অথবা পূর্ণ করেছেন।

n লেখক :চিত্রশিল্পী