উন্মুক্ত শিক্ষার ক্ষুদ্র পরিসর থেকে আজকের উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। যাকে আমরা বলি বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় বা বাউবি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের একজন উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা সম্প্রতি বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিদর্শনের জন্য বেশ কিছু জেলা ভ্রমণ করেন। তার ভ্রমণসঙ্গী হওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। তিনি রাঙ্গামাটি গিয়েছেন। পার্বত্য এলাকায় বাউবির শিক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন। পাহাড়ের চূড়ায় বৌদ্ধবিহারের পাশে গড়ে উঠেছে যে স্কুল সেখানেও বাউবির স্টাডি সেন্টার দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। দুর্গম সেসব অঞ্চলে বাউবির শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে দেখে তিনি বিমুগ্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘দেশের নানা প্রান্তে, বাউবির কার্যক্রম যে
শিক্ষার উত্কর্ষের ছবি, সম্ভাবনার ছবি, এগিয়ে চলার ছবি যে কাউকে স্বপ্নচারী না করে পারে না। কারণ শিক্ষার উত্কর্ষের সঙ্গে একটি জনগোষ্ঠীর, একটি সমাজের, একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক উত্কর্ষ ও সমৃদ্ধি জড়িত। শিক্ষা শুধু জ্ঞানকে পরিশীলিত করে না, শিক্ষা চিন্তাকেও বিকশিত করে। আমরা মানুষের স্বাভাবিক আঙ্গিক যদি বিবেচনা করি, তাহলে দেখব সব মানুষই এক। অবয়বগত কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু এ মানুষটির ভেতরে রক্ত-মাংস ছাপিয়ে যে ছন্দ আছে, ঝংকার আছে, সুর ও সুরের মূর্ছনা আছে তা কি কোনোভাবে অনুধাবন করা সম্ভব! সম্ভব তখনই, যখন সে নৃত্য শিখবে।
একইভাবে শিক্ষার মাধ্যমে লব্ধজ্ঞান যে কোনো মানুষকে নতুন শক্তিতে উজ্জীবিত করে। ঋদ্ধ করে। সে শিক্ষা যে কোনো মাধ্যমেই হতে পারে। তাল-লয়ের জ্ঞান যেমন মানুষকে মূর্ত করে শিল্পভঙ্গিমায়, তেমনি শিক্ষা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান তাকে করে আশাবাদী-স্বপ্নচারী ও অগ্রগামী। বিষয়ভিত্তিক যে কোনো জ্ঞানই মানুষকে বাড়তি শক্তি জোগায় তাকে বিশেষায়িত জ্ঞানের অধিকারী হিসেবে গড়ে তোলে। সমরজ্ঞান একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য যেমন সত্য, প্রকৃতি জ্ঞানও একটি রাষ্ট্রের বা দেশের বাস্তব্যশৃঙ্খলা (ecology) বা প্রকৃতির শৃঙ্খলা বিনির্মাণে সচেষ্ট। একইভাবে সামাজিক স্রোত বা তার বিপরীত ধারা বুঝতে হলেও আমাদের জ্ঞানার্জনের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের যেমন প্রয়োজন, একইভাবে প্রয়োজন পঠিত জ্ঞানেরও।
সমুদ্রের দ্বীপাঞ্চলে বা নদীর কোনো চরে যে মানুষের জন্ম ও বেড়ে ওঠা, অবশ্যই কোনো পাহাড়ে বা পার্বত্য অঞ্চলে জন্ম নেওয়া মানুষের বিশ্বাস, দর্শন বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়াগুলো সে তুলনায় স্বতন্ত্র। এখানে তা এক করার কোনো সুযোগ নেই। আবার রাঢ় অঞ্চলের শুকনো মরুময় মাটিতে যে মানুষের জন্ম বসবাস, সবুজ অরণ্যবেষ্টিত জীবন নিয়ে যার জীবন দেখা এবং জীবনের দ্রষ্টব্য নির্মাণ হয়েছে, দুই জনের জীবনধারা কখনো এক হতে পারে না। জীবনধারা ভিন্ন বলে তাদের স্বপ্ন, বিশ্বাস দর্শন থেকে শুরু করে তাদের দুই জনের মনোভূগোলের গঠনেও সে স্বাতন্ত্র্য লক্ষ করা যায়।
বাউবির একজন পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষার্থীর জন্য যে বই পাঠ্য, একই বই পাঠ্য সুদূর সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের কোনো শিক্ষার্থীর জন্যেও। একই বই একই লেখকের লেখা একই পাঠ্যক্রম—দুই জন শিক্ষার্থী বসে পাঠ নিচ্ছে দেশের দুই প্রান্তের দুই ভিন্ন অঞ্চলে বসে। এখানে আঞ্চলিক সূত্রে দুই শিক্ষার্থীর মধ্যে মননের গড়নে দূরত্ব থাকলেও পাঠসূত্রে দুই জনে কিন্তু একই সুতোয় গাঁথা। এ বন্ধন আরো সুদৃঢ় করতে বাউবি হাতে নিয়েছে Interactive Virtual Class Rooms (IVCR) কার্যক্রম। এছাড়া ই-বুকের মাধ্যমে বাউবি ওয়েবসাইটে সংরক্ষণ করা হয়েছে ৪৫০টির বেশি পাঠ্য বই। সে বই থেকে যে কোনো বিষয় যে কোনো অধ্যায় যে কোনো জায়গায় বসে ডাউনলোড করা সম্ভব। এছাড়া দেশের খ্যাতনামা শিক্ষকদের ক্লাস লেকচার রেকর্ড করে এসডি কার্ডের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এর ফলে যেসব শিক্ষার্থী টিউটোরিয়াল ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারেনি বা সুযোগ পায়নি কিংবা যাদের বসবাস নেটওয়ার্কের বাইরে তারা এসডি কার্ড ক্রয় করে গুরুত্বপূর্ণ লেকচারগুলো শোনার সুযোগ পাবে। এছাড়া ওয়েব টিভি এবং ওয়েব রেডিওর মাধ্যমেও শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠ্য বিষয়ের লেকচার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
বেতার ও টিভিতে বাউবি অনুষ্ঠানে যেসব লেকচার সম্প্রচারিত হয়ে থাকে, সেসব প্রোগ্রাম BouTube, YouTube, ফেসবুক এবং ট্যুইটারের মাধ্যমে আপলোড করা আছে। ওসাপস অনলাইন পদ্ধতির মাধ্যমে ঘরে বসেই এখন বাউবির শিক্ষার্থীরা ভর্তি হতে পারছে তাদের আরাধ্য প্রোগ্রামে। ঘরে বসেই অনলাইনে জানতে পারছে তার পরীক্ষার ফলাফল।
শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই সাপ্তাহিক ছুটির দিনে টিউটোরিয়াল সেবা প্রদান করা হয় এবং যথারীতি পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, নিয়মিত টিউটোরিয়াল ক্লাসে যারা যায়, শিক্ষকের সান্নিধ্য যারা পায়, তাদের বাড়তি একটু আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। সে কারণে প্রতিটি টিউটোরিয়াল ক্লাসের প্রতি তাদের আগ্রহের কমতি থাকে না। সে আগ্রহ থেকে তার মধ্যে যে প্রত্যয়, যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয় তাই তাকে পরীক্ষার বৈতরণী পার হতে সহায়তা করে। এবং অনায়াসে সে পাশ করে যায় কৃতিত্বপূর্ণ ফল নিয়ে।
শিক্ষার মূল লক্ষ্য মানুষের ভেতর মনুষ্যত্ব প্রতিষ্ঠা করা। মূল্যবোধ তৈরি করা। এসব গুণা না থাকলে শিক্ষা অপূর্ণ থেকে যায়। তাই বাউবির শিক্ষাধারায় যারা যুক্ত হয়েছে তারা যেন অপার্থিব এক সুযোগ লাভ করেছে। একসময় শিক্ষার সুযোগ হারিয়ে যারা অনিশ্চয়তার অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছিল, বাউবির শিক্ষা সেই স্থবিরতায় গতি সঞ্চার করেছে। প্রাণের সঞ্চার করেছে। নতুন বাস্তবতার সঙ্গে তার স্বপ্নকে এক করে দিয়েছে। তাই স্কুল পাশ করেনি যে, সে আজ এসএসসি পাশ করছে। এসএসসি পাশ করে যে রুদ্ধ দেওয়ালে অন্ধকার দেখছিল, সে আজ এইচএসসি পাশ করছে। এইচএসসি পাশ করে ঝরে পড়েছিল যে সে শিক্ষার্থী আজ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করছে বাউবির কল্যাণে।
যে চাকরি ক্ষেত্রে পদোন্নতি বঞ্চিত ছিল নতুন শিক্ষাধারায় সনদপ্রাপ্ত হয়ে সে উচ্চতর পদে পদোন্নতি পাচ্ছে। এতে সে যে কেবল সামাজিকভাবে মর্যাদাশীল হচ্ছে তা নয়, আত্মবিশ্বাসের দিক থেকেও সে অনেকদূর এগিয়ে যাচ্ছে। যা তার আগামী দিনের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে এবং যখন যেখানে যা প্রয়োজন তা বলবে, যা করা প্রয়োজন তা করবে। কারণ সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক গভীর দার্শনিক প্রজ্ঞা তার মধ্যে গড়ে উঠবে, যা তার দীর্ঘদিনের কর্ম-অভিজ্ঞতা ও সামাজিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির মিথস্ক্রিয়ায় গড়ে উঠেছে।
বাউবির শিক্ষাকার্যক্রমের অনিবার্যতা আজ প্রতিষ্ঠিত। তার ওপর কোভিড-১৯ বিপর্যয় তাকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। অর্থাত্ দূরশিখন এবং এর বিকাশ প্রযুক্তির উন্নয়ন ও বিকাশের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একসময় অনলাইন ও ডিজিটাল পদ্ধতি কেবল বাউবি শিক্ষাকার্যক্রমে ব্যাপকভাবে জড়িয়ে ছিল। আজ তা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই অনুসৃত হচ্ছে, সমাদৃত হচ্ছে বিস্ময়করভাবে। আমাদের প্রযুক্তি জ্ঞানের কাছে কোভিড পরাজিত হয়েছে। দূরশিখন শিক্ষাধারায় প্রযুক্তিকে যেভাবে ব্যবহার করছে বাউবি, তা আজ আদরণীয় বরণীয় হয়ে উঠেছে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ফলে কোভিড বিপর্যয়ে দেশ থমকে গেলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকই এগিয়ে যাচ্ছে তার লক্ষ্যে-পূর্ণগতিতে। একইভাবে শিক্ষার্থীরাও সমানভাবে ঘরে বসে পাঠ গ্রহণের বিকল্প এ ধারার সঙ্গে ক্রমেই নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত হচ্ছে। জড়িয়ে নিচ্ছে নিজেদের দৈনন্দিন জীবনধারায়।
এ প্রসঙ্গে বলতে ইচ্ছে করে, দিগন্তে উঁচু-নিচু পাহাড়ের মধ্যে যে বৈসাদৃশ্য যে দূরত্ব, যে অসমতা, একদিন তা সবই ঘুচে যাবে। কারণ বাউবির শিক্ষা প্রান্তিক মানুষকে কেন্দ্রে, পাহাড়ের খাদের মানুষকে পাহাড়ের চূড়ায় অধিষ্ঠিত করতে চায়। অর্থাত্ শিক্ষার মাধ্যমে সব রকম অসাম্য দূর করে সামাজিক সমতা বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখাতে চায় বাউবি। একটি সমাজে সাম্যের শেকড় যত গভীরে প্রোথিত হবে, সে সমাজের মূল্যবোধ তত বেশি বলিষ্ঠ ও সক্রিয় হবে। বলিষ্ঠ মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজে কখনো ক্ষয়িষ্ণুতা বাসা বাঁধতে পারে না। সক্রিয়তা, চলমানতা ও পরিবর্তনশীলতাই সে সমাজের ধর্ম। সে সমাজ বিনির্মাণ করাই বাউবির স্বপ্ন।
n লেখক :গবেষক ও কথাশিল্পী
