এম এ ওয়াদুদ :দেশপ্রেমে নিবেদিত রাজনীতিক

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২০, ২১:৪৫

এম এ ওয়াদুদ ছিলেন অবিচল, নীতিমান রাজনীতিক। ভাষাবীর, লেখক, সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা ও বাঙালি নিবেদিত সংগঠক। পাকিস্তানের সূচনালগ্ন থেকে বাংলাদেশের অভ্যুদয় পর্যন্ত আন্দোলন-সংগ্রামের ক্ষেত্র প্রস্তুত, সমন্বয় সাধন এবং বাঙালির চিন্তা-চেতনাকে তাত্পর্যপূর্ণভাবে সামনে এগিয়ে নেওয়ার অন্যতম কান্ডারি। ১৯২৫ সালের ১ আগস্ট চাঁদপুর জেলার রাঢ়িরচর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

১৯৪৮ সালে যখন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠিত হয় তখন এম এ ওয়াদুদ ঢাকা নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। ১৯৫৩ সালে, ছাত্রলীগের যে কাউন্সিলে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়, সে কাউন্সিলে এম এ ওয়াদুদ পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি চর্চায়।

বাঙালির রাষ্ট্রভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা অবিস্মরণীয়। কারাগারের রোজনামচায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘প্রথম ভাষা আন্দোলন শুরু হয় ১১ মার্চ ১৯৪৮ সালে। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ (এখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ) ও তমদ্দুন মজলিসের নেতৃত্বে। ঐদিন ১০টায় আমি, শামসুল হক সাহেবসহ প্রায় ৭৫ জন ছাত্র গ্রেফতার হই এবং আবদুল ওয়াদুদসহ অনেকেই ভীষণভাবে আহত হয়ে গ্রেফতার হয়।’ ১৯৪৮ সালে যুবলীগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তার ছিল অসামান্য অবদান। রাষ্ট্রভাষার লড়াইয়ে এম এ ওয়াদুদ ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারিতে গ্রেফতার হয়ে প্রায় ছয় মাস জেল খেটেছেন। আহমদ রফিকের নিবন্ধ পাঠে জানা যায়, ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ। ১৯৫১ সালের মার্চে গঠিত সেই যুবলীগেরও অন্যতম সদস্য ছিলেন এম এ ওয়াদুদ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম কমিটি (১৯৫১) ও সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের (১৯৫২) সদস্য ছিলেন।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ-বৈষম্যের কারণে ১৯৪৯ সালে পূর্ববঙ্গে চরম খাদ্যসংকট দেখা দেয়। এ সংকটকে গুরুত্ব না দিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান রাজকীয় সফরে এসে পল্টনে সমাবেশ করেন। প্রতিবাদে এম এ ওয়াদুদ ছাত্রদের নিয়ে সমাবেশের সামনে মিছিল করেন, স্লোগান ধরেন। ঐতিহাসিকভাবে এটি ভূখামিছিল হিসেবে পরিচিতি। এ কারণে তাকে প্রায় ছয় মাস কারাগারে বন্দি রাখা হয়। মেধাবী ছাত্র এম এ ওয়াদুদকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল ১৯৪৯ সালে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারীদের আন্দোলনে একাত্মতার কারণে। সে আন্দোলনে নেতৃত্বের কারণে বঙ্গবন্ধুও বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফন্ট্রের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন এম এ ওয়াদুদ। ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতাহীন হলে তাকেও রাজবন্দি করা হয়।

এম এ ওয়াদুদ অনেক গুছিয়ে কথা বলতেন— বজ্রকণ্ঠে স্লোগান ধরতেন। আন্তরিকতা, দক্ষতা, সাহসিকতার ফলে কর্মীরা তার সকল উদ্যোগে সাড়া দিতেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর হাত থেকে চূড়ান্ত মুক্তিলাভের সংগ্রামে একাগ্রতা, বিরামহীন অবিচলতা এবং বন্ধুবত্সল হূদয়ের কারণে সমসাময়িক দল-মত, সমাজে তার অনেক সুহূদ ও ভাবশিষ্য ছিল। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেছেন, “...জাতির পিতার সঙ্গে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি সক্রিয় ছিলেন।...দেশের জন্য তার অনেক অবদান রয়েছে।...তার অমায়িক ব্যবহারে সকলেই মুগ্ধ হতেন।” সমসাময়িক নেতৃবৃন্দও তাকে পছন্দ করতেন—কর্মসূচি বাস্তবায়নে নির্ভর করতেন। ১৯৫২ সালে অসুস্থ অবস্থায় ওয়াদুদ গ্রেফতার হলে বঙ্গবন্ধু উদ্বেগ জানান এবং তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে চিঠি লিখেন। ১৯৫৬ সালে নিজের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ফেলে রেখেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দী বিমান থেকে নেমে অসুস্থ ওয়াদুদকে দেখতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলেন।

১৯৫২ সালের চীন সফর নিয়ে ‘আমার দেখা নয়া চীন’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন “যেয়ে দেখি মানিক ভাই বসে রয়েছেন, কোনো প্রস্তুতি নাই। উনি ঠিক করেছেন যাবেন না, কারণ টাকার অভাব; বিশেষ করে ইত্তেফাকের লেখা কে লিখবে, টাকার জোগাড় কে করবে?...ওয়াদুদের ওপর সমস্ত ভার দিলেন।” আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ভাষায়, “...ওয়াদুদ ভাই ইত্তেফাকের জন্য লিখতেন, পত্রিকার সার্কুলেশন ও বিজ্ঞাপন বিভাগ চালাতেন। আবার পত্রিকা বিক্রি করার জন্য রাজপথে হকারিও করতেন।” ইত্তেফাকের জন্য যে কোনো পরিশ্রম, দুঃখ-কষ্ট এম এ ওয়াদুদ মেনে নিতেন। ডা. দীপু মনি লিখেছেন, “ইত্তেফাক ছিল তার প্রাণ। বাঙালির অধিকার আদায় ও স্বাধীনতা অর্জনে আওয়ামী লীগের এক বড় হাতিয়ার। তাই ইত্তেফাক চালানোর অর্থ তার কাছে তার রাজনীতিতে দায়িত্ব পালন।”

স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে বাংলাদেশ পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস করপোরেশনের বিপণন পরিচালকের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ এবং নেতাকর্মীদের সংগঠিত করায় ক্ষমতাসীন সামরিক শাসকচক্র তাকে দায়িত্ব থেকে অপসারণ করে। ডা. জাওয়াদুর রহিম ওয়াদুদ বলেছেন, “১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাবাকে মন্ত্রিসভায় যোগদানের জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। বাবা রাজি না হওয়াতে তাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে তিন তিনবার জেলে প্রেরণ করেন। এ সময় তার শরীর একদম ভেঙে পড়ে।” এম এ ওয়াদুদ দীর্ঘদিন লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত ছিলেন—কিন্তু আপস করেননি। নিজ আদর্শে অবিচল থেকেছেন জীবনের শেষ দিন ২৮ আগস্ট, ১৯৮৩ পর্যন্ত।

n লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক