লোভেরও তো একটি সীমা থাকা উচিত

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২০, ২১:৪৩

একজন মানুষ যখন জোরজবরদস্তি কিংবা সহিংসতার মাধ্যমে কোনো কিছু আদায় করিতে চাহে তখন ইংরেজিতে তাহাকে বলা হয় ‘এক্সটরশোনিস্ট’। বাংলায় বলা হয় ‘চাঁদাবাজ’। এলাকার প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তি বা মহল অথবা গোষ্ঠী যখন দেখেন, তাহার নাকের ডগার উপর দিয়া কেহ লাভজনক কোনো কার্য সম্পাদন করিতেছেন তখন সেই মতলববাজ মহল একধরনের ‘কর’ দাবি করিয়া বসেন। অর্থাত্ তুমি ‘লাভ’ করিবা, তাহার কিছু ‘লভ্যাংশ’ আমাকে দিবা না—তাই হয়?

ইহা যে অন্যায্য এবং অন্যায়—তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। কোনো রাষ্ট্রের নিজস্ব শক্তির শিথিলতা থাকিলে, সেই আলগা জায়গা দিয়া রাষ্ট্রের সমান্তরালে ‘পকেট রাজস্ব’ কায়েম করিতে চাহে কতিপয় গোষ্ঠী। এই উপমহাদেশে চাঁদাবাজির সমস্যা বহুদিনের। এখনো সংবাদপত্রে প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন ধরনের চাঁদাবাজির খবর ছাপা হয়। হুমকি ও চাঁদা দাবির মুখে বন্ধ হইয়া গিয়াছে চট্টগ্রাম ওয়াসার ভান্ডালজুরি পানি প্রকল্পের কাজ। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদ হইতে জানা যায়, চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে কোরিয়ান ঠিকাদার কোম্পানি তাইয়াংগ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনের অধীনে প্রকল্পটির পাইপলাইন স্থাপনের কাজ চাঁদার দাবিতে বাধা দেওয়া হইয়াছে। অভিযোগ আছে যে, এই কাজে বাধা দিয়াছেন স্থানীয় এক নেতা। সচিত্র প্রতিবেদনে দেখা যায়, যন্ত্রপাতি যেইখানে যেই অবস্থায় ছিল, সেইভাবে রাখিয়াই জোরপূর্বক কাজ বন্ধ করিয়া দিয়াছে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল। মাত্র কয়েক দিন পূর্বেই আমরা এই কলামে বলিয়াছি যে, বহুদিন ধরিয়া আমরা এই ধরনের চিত্র দেখিয়া আসিতেছি রাজনৈতিক অঙ্গনে। ক্ষমতাসীন দল হঠাত্ বিশাল রাজনৈতিক দলে পরিণত হইয়া যায়। তাহার পর এই ক্ষমতাসীন দলের ভুঁইফোঁড়রা অত্যাচার-নির্যাতন, টেন্ডার দখল, অফিস দখলে মত্ত হইয়া উঠেন। আমরা দুঃখের সহিত লক্ষ করিয়াছি, ইহাদের কর্মকাণ্ড এতটাই প্রকট হইয়া উঠে যে, প্রশাসনিক এবং উন্নয়নমূলক কাজকর্ম বহুক্ষেত্রেই দারুণভাবে ব্যাহত হইতে থাকে। আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলিতে চাই, যাহারা এই ধরনের কাজ করেন, তাহারা অনুপ্রবেশকারী, আদর্শহীন রাজনীতি-ব্যবসায়ী। রাজনীতি তাহাদের নিকট শর্টকাটে বিপুল অর্থ উপার্জনের উপায় ছাড়া আর কিছু নহে। দুর্নীতি দমন কমিশনও ইতিপূর্বে জানাইয়াছে, তাহারা লাখ লাখ অভিযোগ পান ১০৬ নম্বরে। কিন্তু তাহারা ঐ সকল অভিযোগের মাত্র ২ ভাগ তদন্ত করিতে পারেন। বাকি ৯৮ ভাগ তাহাদের আওতার বাহিরে বিধায় সংশ্লি­ষ্ট অফিসে পাঠাইয়া দেন।

অতীতের মতো এখন মানুষের আর অভাব নাই। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলিতে হয়, মানুষের বৃহত্ একটি অংশ এখন লোভের বশেই দুর্নীতি করে। তবে লোভেরও তো একটি সীমা আছে। মুশকিল হইল, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া দুর্নীতি দমন করা যায় না। ক্ষমতাসীন দলই হউক বা ক্ষমতার বাহিরে থাকা দলই হউক, সকলেরই উচিত দলকে যে কোনো ধরনের অপব্যবহার হইতে মুক্ত করা। বিশেষ করিয়া, যেই দল সরকারে থাকে তাহাদের জন্য ইহা গুরুদায়িত্ব। মনে রাখিতে হইবে, একটি দল ক্ষমতায় থাকিতে অপাঙেক্তয় ব্যক্তিদের দ্বারা যতটা দূষিত হয়, দল ততই দুর্বল হইতে থাকে। এই জন্য দুর্নীতির শেকড়কে গোড়া হইতে কর্তন করা বাঞ্ছনীয়।