প্রকৃতির ওপর রাজত্ব নয়

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২০, ২১:৪৪

 

প্রকৃতি বলতে আমাদের সামনে ভেসে ওঠে সবুজে ঘেরা এক অরণ্য। আমরা যাকে বন বলে থাকি। একটি বনে রয়েছে অসংখ্য জীববৈচিত্র্য। পশুপাখির অবাধ বিচরণ, সবুজে আবৃত মনোরম পরিবেশ যা আমাদের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় রাখছে অসামান্য ভূমিকা।

একটি দেশের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা দরকার, আমাদের আছে মাত্র ১৭ শতাংশ। কোনোভাবেই বনভূমি বাড়ানো যাচ্ছে না। যে সুন্দরবন ছিল সুরক্ষিত সেই সুন্দরবনও এখন মানুষের অধিক ব্যবহারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক বন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বনভূমি। কিন্তু মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে কক্সবাজারের বিশাল বনভূমির ক্ষতি হয়েছে।

বৈশিষ্ট্যগতভাবে বাংলাদেশের বনগুলোকে কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। যেমন চিরহরিত্ বন, ক্রান্তীয়প্রায় চিরহরিত্ বন, ক্রান্তীয় পর্ণমোচী বন, মিঠা পানির জলাভূমি বন, প্যারা বন বা ম্যানগ্রোভ বন ও সৃজিত বন। সুন্দরবনের ৬৫ শতাংশ রয়েছে আমাদের দেশে। প্রাকৃতিক সম্পদের আধার এই বন। হাজার হাজার পশুপাখি, প্রাণী এমনকি মানুষও বেঁচে থাকার জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সুন্দরবন বাংলাদেশের জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এ বনের যথাযথ সংরক্ষণ করছি না।

প্রাকৃতিক সম্পদ অতিরিক্ত আহরণের ফলে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। পরিবর্তন হচ্ছে জলবায়ু। নদী অনাব্য হয়ে পড়ছে। ভূমিধস, নদী ভাঙন, অতি বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করছে। গাছপালা কেটে, নদী ভরাট করে তৈরি করা হচ্ছে হাইরাইজড বিল্ডিং। ভূগর্ভের পানি অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে নেমে যাচ্ছে পানির স্তর। স্বাদু পানির ঘাটতি দেখা দিচ্ছে বিভিন্ন এলাকায়। উচ্চ ঘনত্বের লবণাক্ত পানি দখল করছে মিঠা পানির নেমে যাওয়া স্তরগুলোতে। প্রকৃতির ওপর মানুষের অত্যাচার থেমে থাকছে না তবু।

প্রকৃতিকে বাঁচানোর জন্য, এর সংরক্ষণের জন্য জাতিসংঘসহ অনেক সংস্থা বিশ্বব্যাপী কাজ করে যাচ্ছে। মরুকরণ প্রক্রিয়া রোধে নেওয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। ওজোনস্তরের ক্ষতি হ্রাসে করা হচ্ছে অনেক কিছু। এই করোনাকালে এন্টার্টিকের ওপরের ওজোনস্তরের অনেকটাই উন্নতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার কমাতে হবে। সাধন করতে হবে পরিবেশের টেকসই উন্নয়ন ও পুনঃনির্মাণ। ভবিষ্যত্ প্রজন্মের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে বৃক্ষরোপণ করতে হবে এবং অন্যকেও এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

মানুষ সৃষ্টির শুরু থেকেই প্রকৃতির ওপর রাজত্ব করতে চেয়েছে। কিন্তু মানুষ ভুলে যায় যে প্রকৃতির প্রত্যেকটি বিষয়ের সঙ্গে তাদের জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। অবাধে পশু শিকার, মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়ানো পাখিকে খাঁচায় বন্দি করে রাখা, নির্বিচারে গাছকাটা, জলাশয় ভরাট করে বসবাসের জন্য ঘরবাড়ি নির্মাণ, বনের জমি দখল মানুষের অভ্যাসে রূপ নিয়েছে। যার ফলে প্রকৃতি তার নিজস্ব গতিবিধি হারিয়ে ফেলছে। আমরা ভুলে যাই যে, ডাইনোসরের মতো শক্তিশালী প্রাণী পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে প্রকৃতির বিরূপ পরিবর্তনের ফলে। তাই নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য হলেও প্রকৃতিকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। প্রকৃতির ওপর রাজত্ব নয় বরং প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে চলতে হবে। তা না হলে ডাইনোসরের মতো পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে মানব জাতি। পরিশেষে, পরিবেশ রক্ষায় নিজেদের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করতে হবে নিজ নিজ অবস্থান থেকে।

শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ,

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ