আসাদুজ্জামান আসাদ
বাংলাদেশে যে কজন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধপ্রেমী নির্লোভ সত্ ও প্রকৃত খ্যাতিমান মানুষ ছিলেন, তাদের মধ্যে জনাব রাহাত খান একজন। ১৯৪০ সালে কিশোরগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণকারী রাহাত খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে ময়মনসিংহ নাসিরাবাদ কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ ও জগন্নাথ কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে তার বিশাল কর্মময় জীবনের সূচনা করেন।
ষাটের দশকে রাহাত খান শিক্ষকতা ছেড়ে সাংবাদিকতা শুরু করেন। তখন সাংবাদিকদের ইশ্বরের প্রতিরূপ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এক্ষেত্রে রাহাত খানের রয়েছে বিশাল বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের ইতিহাস। তার দীর্ঘকালের কর্মজীবন ছিল দৈনিক ইত্তেফাক। ইত্তেফাকে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন বহু বছর। এই পত্রিকায় চতুরাঙ্গ কলামের ‘সুহূদ’ ছদ্দ নামে কয়েক দশক কলাম লিখেছেন তিনি।
রাহাত খান দেশের বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে একজন। লাভ করেছেন একুশে পদক। রয়েছে অসংখ্য রচনা ভান্ডার। সর্বশেষ বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
রাহাত খান গুরুতর অসুস্থ হয়ে ভর্তি ছিলেন ঢাকার বারডেম হাসপাতালে। অবস্থা ভালো-মন্দের মাঝখানে কেটেছে দুই মাসের বেশি। যেহেতু বয়স ৮০ পেরিয়েছে, সেহেতু চিকিত্সকেরাও খুব বেশি আশাবাদী ছিলেন না।
বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী রাহাত খানের মতো মানুষের খুব প্রয়োজন ছিল আমাদের। কিন্তু বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেছি যে দীর্ঘদিন গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি থাকার পরেও মিডিয়ায় কিংবা সরকারের তরফ থেকে তার প্রতি খুব বেশি দায়িত্ববোধের পরিচয় পাওয়া যায়নি। তার চিকিত্সার খরচ মেটানো নিয়ে তৈরি হয়েছিল নানা সংশয়! নিজের বলতে ঢাকায় বসবাসের একটি ফ্ল্যাট ছাড়া তার তেমন কিছুই ছিল না। দুই মাসেও জনাব রাহাত খানকে দেখতে আসেননি সরকারের পক্ষের কোনো ব্যক্তি, শুনিনি তার জন্য অর্থসহায়তার কথা।
রাহাত খানের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল ৪০ বছরের বেশি। আমাদের গভীর সম্পর্কের অনেক স্মৃতিকথা আজ আমাকে বিপুলভাবে নাড়া দিচ্ছে। তিনি বাংলাদেশের সাহিত্য ও সাংবাদিকতা জগতের জীবন্ত কিংবদন্তি। অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও মূলত সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় তিনি বিপুল খ্যাতি অর্জন করেন।
তার সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল ঢাকা ক্লাবে। শেষের দিকে এখানেই বেশি সময় কাটাতেন তিনি। শেষবার আমাকে বলেছিলেন, ‘পারলে রোজ এসে আমার সঙ্গে দেখা করে যেও।’ রাহাত ভাই, আপনার ‘সমস্যা’ আমি জানতাম। কিন্তু আপনার মতো বিশাল মানুষকে কিইবা সমাধান দিতে পারতাম!
শেষ মুহূর্তে প্রিয় মানুষগুলোর সান্নিধ্য খুব দরকার ছিল রাহাত ভাইয়ের। কিন্তু তা থেকে পুরোপুরিই বঞ্চিত ছিলেন তিনি। রাহাত ভাই, একসময় আপনার সান্নিধ্য পেতে মানুষ লাইন ধরে থাকত! সেই আপনি জীবনের শেষ দিকে অনেক একা হয়ে গিয়েছিলেন! কী বিচিত্র মানুষের জীবন। শেষ মুহূর্তের কিছু কষ্ট শেয়ার করেছিলেন আমাকে।
মনে পড়ে আশি-নব্বইয়ের দশকে আমাদের সেই সব উজ্জ্বল দিনের কথা। মাঝরাতে ইত্তেফাক থেকে বেরিয়ে হেঁটে হেঁটে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা, আপনার চামেলিবাগের বাসায় যাওয়া, কখনো কখনো কোনো হোটেলে বসে খাওয়া, আমার ধানমন্ডির বাসায় এসে আড্ডা দেওয়া, আমার সঙ্গে যশোরে যাওয়া...সে ছিল এক অন্যরকম জীবন। আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ থেকে শিল্প-সংস্কৃতি আর প্রগতির চাকা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। ঢাকা শহরে এসে আমার সংগ্রামী জীবনে প্রতিষ্ঠা পেতে আপনার সহযোগিতা পেয়েছি, বয়সের ব্যাবধান সত্ত্বেও বন্ধুর মতো কাছে টেনে নিয়েছেন। কত স্মৃতি, কত কথা খুব মনে পড়ছে আজ রাহাত ভাই। ওপারে ভালো থাকুন প্রিয় রাহাত ভাই, বাংলাদেশ আপনাকে মনে রাখবে। ওপারে ভালো থাকুন প্রিয় রাহাত ভাই, বাংলাদেশ আপনাকে মনে রাখবে।
n লেখক : মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও
বহু গ্রন্থের প্রণেতা
