টারান্টের শাস্তি ও শ্বেতাঙ্গ রাজনীতি

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২০, ২১:৫৩

মো. জাহিদ হাসান

‘টারান্টের অপরাধ এতই বিদ্বেষপূর্ণ যে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও তার জন্য যথেষ্ট নয়। এ ঘটনায় নিউজিল্যান্ডের হূদয়ে প্রচুর ক্ষত ও আঘাত তৈরি হয়েছে। আপনি ঠান্ডা মাথায় ভেবেচিন্তে তিন বছর বয়সি শিশুকেও হত্যা করেছেন, যে তার বাবার পা জড়িয়ে ধরেছিল’—গত ২৭ আগস্ট এভাবেই নিউজিল্যান্ডের একটি আদালতে শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসী ব্রেন্টন টারান্টকে ধিক্কার জানাচ্ছিলেন বিচারক ক্যামেরন মেন্ডার। ২০১৯ সালের ১৫ মার্চ ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে বন্দুক নিয়ে গুলি করে ৫১ জনকে হত্যা করে। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিল সে হামলা থেকে। অভিযুক্ত টারান্টকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তি দিয়েছে আদালত। প্যারোলে মুক্তি পাওয়ারও কোনো সুযোগ থাকবে না। এই প্রথমবারের মতো নিউজিল্যান্ডে প্যারোল ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তি দেওয়া হলো। তাকে আমৃত্যু কারাগারে থাকতে হবে। এই সাজা বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়ার একটি মাইলফলক। তবে চিন্তার বিষয় হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী নতুন করে এক ধরনের বর্ণবাদী আচরণ লক্ষ করা যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আটলান্টিকের ওপারে ইউরোপের দেশগুলোতেও বর্ণবাদী আচরণ ও শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

ক্রাইস্টচার্চের ঘটনা বিশ্লেষণ করলে তিনটি ইতিবাচক ফলাফল আমরা দেখতে পাই। প্রথমত, নিউজিল্যান্ডের অস্ত্র আইনে পরিবর্তন। দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের ঘটনার পর দেশটির আইন প্রণেতারা সেমি-অটোম্যাটিক অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে ভোট দেন। এতে দেখা যায়, অস্ত্রটি নিষিদ্ধের পক্ষে ১১৯ এবং বিপক্ষে মাত্র এক ভোট পড়ে। দ্বিতীয়ত, চরমপন্থার বিরুদ্ধে দেশটির তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। ‘হেড-স্কার্ফ ফর হারমনির’ কথা মনে আছে কি? হামলার পর দেখা যায় মুসলিম মহিলারা হিজাব পরে বাইরে বেরুতে ভয় পাচ্ছেন। তাদের  প্রতি সমর্থন জানাতে এক দিনের জন্য দেশটির নারীরা হেড-স্কার্ফ পরে দেশ জুড়ে কর্মসূচি পালন করে। এটি এই বার্তা দেয় যে, সন্ত্রাসবাদ বিভক্তি সৃষ্টির জন্য হলেও, এটা মানুষকে এক করতে পারে। তৃতীয়ত, টারান্টকে নিউজিল্যান্ডের আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়েছে। দেশটির বিচারব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হলেও মৃত্যুদণ্ডের বিধান না থাকায় কেউ কেউ কিছুটা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এক্ষেত্রে, যেহেতু দেশটির আইনে সর্বোচ্চ সাজাটাই তাকে দেওয়া হয়েছে, তাই আমি মনে করি যে সুবিচারই হয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডান বিরল নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে উগ্র দক্ষিণপন্থি ও শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। পশ্চিমা বিশ্বে বর্ণবাদ এবং বৈষম্য টিকে থাকার পেছনে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের বিষয় রয়েছে। যেমন—২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্বাচনি এজেন্ডায় ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন ‘হোয়াইট ন্যাশনালইজম’। আবার, হত্যাকারী ব্রেন্টন টারান্ট একজন উগ্র দক্ষিণপন্থি বর্ণবাদী মানুষ। তিনি প্রচণ্ডভাবে মুসলমানবিদ্বেষী। পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে অভিবাসন একটি রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটিকে বর্ণবিদ্বেষী রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে। গত ২৫ মে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা রাজ্যের মিনিয়াপোলিস শহরে পুলিশি নির্যাতনে মারা যান ৪৬ বছরের জর্জ ফ্লয়েড। হত্যাকাণ্ডটি ঘিরে আমেরিকায় ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের বিক্ষোভের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছিল। উইসকনসিনের কেনোশা শহরে গত ২৩ আগস্ট কৃষ্ণাঙ্গ জ্যাকব ব্লেককে পেছন থেকে সাতটি গুলি করে পুলিশ। প্রাণটা বেঁচে গেলেও সে পঙ্গু হয়ে গেছে। ওয়াশিংটন পোস্ট সংবাদপত্রের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সালে আমেরিকায় পুলিশের গুলিতে মারা গেছে ১ হাজার ১৪ জন এবং বেশির ভাগই কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান। অ্যান্টি-ডিফেমেশন লিগের (ADL) হিসাবে গত ১০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী সন্ত্রাসে হতাহতের সংখ্যা বহু। ইউরোপের অনেক দেশেই ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণার আড়ালে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো সংগঠিত হচ্ছে। হত্যাকারী ব্রেন্টন ‘ব্লাক সান’ (কালো সূর্য) নামে একটি নব্য নাজি সংগঠনের সদস্য। শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ ও অভিবাসনবিরোধী আন্দোলনের সংগঠন ‘কু ক্লাক্স ক্ল্যান’(কেকেকে)। ADL কর্তৃক ২০১৭ সালে প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ২২টি অঙ্গরাজ্যে কেকেকে সক্রিয়।

নেলসন ম্যান্ডেলা বর্ণবাদ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমি বর্ণবাদকে ঘৃণা করি, কারণ এটাকে আমি বর্বর জিনিস হিসেবে বিবেচনা করি।  বর্ণবাদ—সে কালো বা সাদা যার কাছ থেকেই আসুক না কেন’। বর্ণবাদ বিশ্বে নতুন কোনো সমস্যা নয়। সম্প্রীতি ও সহযোগিতার নীতি ব্যতীত  শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ ও বিভাজনের রাজনীতি পরাস্ত করা সম্ভব নয়।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়