দুর্নীতি করিতে চাহিলে ঢেউ গণনা করিয়াও করা যায়। বাতাস হইতে কিংবা পানি সেচিয়াও দুর্নীতির সিস্টেম তৈরি করা যায়। এমনই একটি উদাহরণ তৈরি করিয়াছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদ হইতে জানা যায়, সিস্টেমের মধ্যে দুর্নীতি প্রোথিত করিয়া পানিকে টাকায় রূপান্তর করিতেছেন কতিপয় কর্মচারী। চট্টগ্রাম ওয়াসার ক্ষেত্রে দেখা গিয়াছে, ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দিনে পানির উত্পাদনক্ষমতা ছিল ১৩ কোটি লিটার। এই পানি বিক্রয় করিয়া ওয়াসার আয় হইত প্রায় ৩ কোটি টাকা। বর্তমানে চট্টগ্রাম ওয়াসায় পানি উত্পাদিত হইতেছে প্রায় ৩৬ কোটি লিটার। ইহার মধ্যে দুই দফায় পানির মূল্যও বৃদ্ধি পাইয়াছে ২৫ শতাংশ। কিন্তু অবিশ্বাস্য ব্যাপার হইল, পানির উত্পাদন প্রায় পৌনে তিন গুণ এবং মূল্যবৃদ্ধি হইলেও সেই অনুপাতে আয় তেমন বৃদ্ধি পায় নাই।
চাহিলে দুর্নীতি কীভাবে করা সম্ভব, তাহা প্রাচীন একটি গল্প হইতে আমরা অনুধাবন করিতে পারি। প্রাচীনকালে এক রাজা তাহার এক কর্মচারীর দুর্নীতির প্রমাণ পাইয়া তাহাকে দূরে কোনো এক নদীর ধারে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় ঢেউ গণনা করিবার দায়িত্ব দিলেন। ঢেউ গুনিয়া তাহা রাজার নিকট রিপোর্ট করিতে হইবে। নদীতে বড় বড় মালবাহী নৌকা যখন যায় তখন ঢেউ উঠে। কর্মচারী নৌকাগুলিকে থামাইয়া বলে, ‘নৌকা যাইবার সময় ঢেউ বেশি উঠিলে এবং পাড়ের ক্ষতি হইলে জরিমানা প্রদান করিতে হইবে। রাজার কঠোর নির্দেশ।’ ঐ দুর্নীতিবাজ কর্মচারী নদীর পাড়ের রক্ষাকর্তা সাজিয়া বসিল। এইভাবে ঢেউ গণনা করিয়াই ঐ দুর্নীতিবাজ কর্মচারী বিপুল অর্থ উপার্জন করিতে লাগিল। ইহার সারবত্তা হইল, দুর্নীতির মানসজগতে কেহ যখন ডুবিয়া থাকিতে চাহে, তখন তাহাকে আটকানো কঠিন। বাংলাদেশে আমরা দেখিতে পাইতেছি, দুর্নীতি অনিয়ম এখন বহু ক্ষেত্রে সিস্টেমের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িতেছে। অন্তত পত্রিকান্তরে প্রকাশিত উপরিউল্লিখিত প্রতিবেদনটির আলোকে ইহা বলাই যায়। কারণ, চট্টগ্রাম ওয়াসা কাগজে-কলমে প্রতি মাসে সর্বনিম্ন ২৮ হইতে সর্বোচ্চ ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত পানি অপচয় দেখাইতেছে। এই হিসাবে দিনে ‘অপচয়’ ঘটিতেছে অন্তত ১০ হইতে ১২ কোটি লিটার পানি। যেই পরিমাণ পানি লিকেজ বা সিস্টেম লসের মাধ্যমে বাহির হইয়া যাইবার কথা বলা হইতেছে, তাহা যদি সত্যিই বাহির হইয়া যায়, তাহা হইলে অনেক এলাকাতেই বন্যা বহিয়া যাইবার কথা। বাস্তবে তাহা কিন্তু হইতেছে না। অভিযোগ উঠিয়াছে, এই ‘হাওয়া’ হইয়া যাওয়া পানিকে কৌশলে ‘টাকায় রূপান্তর’ করিতেছেন কতিপয় দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারী। অভিযোগের মূল তির মিটার রিডারদের দিকে (বোধগম্য, তাহারা একা নহে)। চট্টগ্রাম ওয়াসায় পানি অপচয়ের ক্ষেত্রে মিটার রিডারদের প্রধান হাতিয়ার ‘নষ্ট মিটার’। ইহা ছাড়া গড় বিল, বাইপাস সংযোগ, অবৈধ সংযোগ এবং মিটারে বিলের ক্ষেত্রে কমবেশি করিয়া সুবিধা আদায় করিয়া থাকেন মিটার রিডাররা।
প্রশ্ন হইল, মিটার রিডাররা চাহিলেই কি নির্বিঘ্নে দুর্নীতি করিতে পারিবেন? বিজ্ঞজনেরা মনে করেন, সিস্টেমের মধ্যে দুর্নীতি প্রবেশ করাইতে হইলে ইহার জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন স্তরের গোপন যোগসাজশ। চট্টগ্রাম ওয়াসায় এই ধরনের দুর্নীতি প্রকৃতই সিস্টেমের মধ্যে প্রোথিত হইয়া গিয়াছে কি না তাহার যথাযথ অনুসন্ধান আবশ্যক।
