আমাদের দেশে জমিজমা লইয়া বিরোধ, সংঘাত-সংঘর্ষ, মামলাবাজি নূতন নহে; ইহা যেন চিরাচরিত ঘটনা। এখনো আমাদের অধিকাংশ মামলা দায়েরের পিছনে রহিয়াছে জায়গা-জমি লইয়া সৃষ্ট দ্বন্দ্ব। সম্প্রতি ভূমি ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়নের ছোঁয়া লাগিয়াছে। ভূমি রেজিস্ট্রি করা হইতেছে কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে। এমনকি ভূমি অফিসগুলিতে গ্রাহক ভোগান্তি দূর করিতে ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা, ভূমিসংক্রান্ত পরামর্শের জন্য হেলপ ডেস্ক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজে ফাঁকি দেওয়া বন্ধে বায়োমেট্রিক অ্যাটেনডেন্স মেশিন স্থাপনসহ অনেক ইতিবাচক উদ্যোগ লওয়া হইয়াছে। তাহার পরও ভূমি লইয়া ঝগড়াঝাঁটি ও কাইজ্যার অন্ত নাই। খাস বা সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন উভয় প্রকার জমি লইয়াই বংশানুক্রমে চলিয়া আসিতেছে মামলা-মোকদ্দমা ও খুনখারাবি। জমির মূল্য বৃদ্ধি এবং জনসংখ্যা অনুপাতে এই দেশের আয়তন কম হইবার কারণে জমি একটি অতি লোভনীয় ও বিবাদবিসংবাদের কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। আর জমি দখল তো সর্বত্রই, সর্বক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হইতেছে। ‘এই জমি আমার’ বলিয়া দখল করা হইতেছে সরকারি-বেসরকারি জমি।
বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভূমিবিরোধজনিত সমস্যা বৃদ্ধি পাইবার মূল কারণ ভূমি আইন বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকা, আইনি জটিলতা ও সামাজিক সংকট। সম্প্রতি এক জরিপে দেখা গিয়াছে, আমাদের ৪১ শতাংশ পরিবার ভূমিবিরোধজনিত সমস্যায় আক্রান্ত। তাহার মধ্যে ৫২ শতাংশ ভূমির সীমানাসংক্রান্ত বিরোধ রহিয়াছে। ইহার পর রহিয়াছে সম্পত্তির উত্তরাধিকার লইয়া বিরোধ। ইদানীং দেখা যাইতেছে, ভূমিবিরোধে জড়িত অধিকাংশ পরিবারের লোক এখন আর মামলা বা আইনিসংক্রান্ত জটিলতায় যাইতে চাহেন না। ইহাও একটি সমস্যা। কেননা ইহাতে অধিকাংশ বিরোধই সমাধানের বাহিরে থাকিয়া যাইতেছে। আর প্রভাবশালীরা তাহারই সুযোগ লইতেছে। এই ক্ষেত্রে ভূমির অধিকার রক্ষায় ও ভূমিবিরোধ নিরসনে সরকারকে বিশেষ উদ্যোগ লইতে হইবে। প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। স্থানীয় প্রশাসনিক কাজে দালালদের দৌরাত্ম্য, ভূমির অধিকার সম্পর্কে অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত তো বটে, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যেও ভূমি ও উত্তরাধিকার আইন লইয়া যে অজ্ঞতা রহিয়াছে তাহা দূর করিতে হইবে। এই সংক্রান্ত মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও ভূমি জরিপের নানা জটিলতার অবসান ঘটাইতে হইবে। জমি ক্রয়বিক্রয়, নামজারি, মিসকেসসহ আরো অনেক বিষয়ের সহজীকরণ করা দরকার। এই জন্য শুধু ভূমি জরিপ ও নিবন্ধন ডিজিটালকরণ করিলেই চলিবে না, ভূমির নকশা ও রেকর্ডপত্রসহ সকল প্রকারের তথ্যাদি কম্পিউটারাইজড করিতে হইবে, যাহাতে জাল-জালিয়াতির সকল পথ বন্ধ হয়। কিন্তু করিবে কে? বিভিন্ন স্তরে সংশ্লিষ্ট যাহারা রহিয়াছেন তাহাদের দায়িত্ব পালন লইয়া অসন্তোষ নূতন নহে।
অন্যদিকে খাসজমির লিজ যাহাদের পাইবার কথা, তাহারা অনেক সময় পাইতেছেন না। ভূমিহীনদের বদলে প্রভাবশালী ব্যক্তিরাই তাহা করায়ত্ত করিয়া লইতেছেন। আবার জেলা প্রশাসন কয়েক বত্সরের জন্য লিজ দিলেও অধিকাংশ সময় তাহা আর নবায়ন করা হইতেছে না। যাহারা এই সকল দেখভাল করিবার জন্য রহিয়াছেন, তাহাদের অবহেলা ও অনিয়মের কারণে এই ভূমিবিরোধ একসময় পরিণত হয় বিষবৃক্ষে। অতএব, শুধু রাজনীতিবিদদের পিছন পিছন না হাঁটিয়া, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও তাহার বিধিবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসাবে তাহাদের দায়িত্ব সূচারুরূপে পালন করা আবশ্যক।
