সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের আধুনিক জীবনে এক নতুন বাস্তবতা। মানুষ তথ্যের জন্য এখন আর পত্রিকার পাতা ঘাঁটাঘাঁটি করে না। তার বদলে এসেছে স্মার্ট ফোন ও আইফোন নির্ভরতা। একদিকে এর যেমন সুফল রয়েছে অন্যদিকে এর অপব্যবহারে রয়েছে কুফল। একদিকে মানুষ যেমন এর সুবিধা ভোগ করছে অপরদিকে এর অপব্যবহারে ঘটাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ। এর ফলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বহু মানুষের জীবন। বর্তমানে করোনা ভাইরাসের মধ্যে এটি যেন আরেকটা ভার্চুয়াল ভাইরাস হিসেবে আঘাত হানছে অনেকের জীবনে। করোনা ভাইরাসের কারণে সারা বিশ্ব যখন লকডাউনে আবদ্ধ ছিল তখন যোগাযোগের একমাত্র পন্থা ছিল ইন্টারনেট। ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল—যেন লকডাউনের মধ্যে মানুষ যে যার অবস্থানে থেকে সব কাজ সম্পাদন করতে পারে। আরেকটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য। করোনা ভাইরাসের মহামারির সংকট মুহূর্তে শিক্ষার্থীরা যেন শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয় সেজন্য চালু করা হয়েছিল অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম। এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল যেন এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা সচল রাখা যায়। এ লক্ষ্যে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানের হাতে তুলে দেয় স্মার্ট ফোন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় অনেক অভিভাবক আছেন যাদের পক্ষে সন্তানদের স্মার্ট ফোন কিনে দেওয়ার মতো সামর্থ্য নেই; কিন্তু এরপরও সন্তানের পড়ালেখা সচল রাখার জন্য জমিজমা বিক্রি করে বা গৃহপালিত পশু বিক্রি করে অথবা ধারদেনা করে তাদের সন্তানের জন্য স্মার্ট ফোন ক্রয় করে এবং ইন্টারনেটের জন্য ইন্টারনেটের সেবা সচল রাখে।
এই ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের অ্যাপস ব্যবহারের সুবাদে শিক্ষার্থীরা ভার্চুয়াল জগতে প্রবেশ করছে। পড়ালেখার জন্য একদিকে যেমন এর সুফল রয়েছে অন্যদিকে এর কুফলও রয়েছে অনেক। বর্তমানে এই ভার্চুয়াল অ্যাপসের অপব্যবহার সমাজের জন্য এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। অনেক সময় গরিব অসহায় পিতা-মাতা জানেন না বা বুঝতে পারেন না তাদের সন্তান মারাত্মক হুমকির মুখে পতিত হচ্ছে। এক শ্রেণির অসত্ ও স্বার্থান্বেষী লোক ইন্টারনেটের অপব্যবহার করে এর সুযোগ নিয়ে কিশোর থেকে শুরু করে তরুণ এবং যুবসমাজসহ সব শ্রেণির মানুষকে বিপথগামী করছে এবং অনেকের জীবনে ধ্বংস ডেকে আনছে। যা বর্তমানে একটি আসক্তিতে পরিণত হয়েছে। গ্রাস করছে সামাজকে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে আজকের শিশু-কিশোররা বিভিন্ন ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, যেমন—ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, ইমো, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদিতে আসক্ত হয়ে পড়ছে। তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হচ্ছে নতুন নতুন মানুষের। এভাবে কেউ কেউ তাদের খুব কাছের মানুষ হয়ে উঠছে; কিন্তু ইন্টারনেটের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবার অপরাধের ঘটনা। একটু অসচেতনতার কারণে ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের বিপদ। সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হলো এক ধরনের প্রযুক্তি যা ভার্চুয়াল সম্প্রদায় এবং নেটওয়ার্কগুলির মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য, কর্মজীবনের বিভিন্ন তথ্য ও ধারণা, ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের মত প্রকাশ ও বিভিন্ন তথ্য ভাগাভাগি (share) করতে সাহায্য করে। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাইবার নিরাপত্তা যদি নমনীয় থাকে তাহলে সাইবার অপরাধীরা এর অপব্যবহার করে ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করতে পারে। টাইমলাইন, নিউজফিড ভরে যায় প্রয়োজনীয়, অপ্রয়োজনীয় সংবাদ, ছবি ও ঘটনায়। এ সুযোগটি করে দিচ্ছে ইন্টারনেট। সারা বিশ্বে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৭০ শতাংশ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংযুক্ত রয়েছে। তরুণদের মধ্যে এ হার আরো বেশি, প্রায় ৯০ শতাংশ। বাংলাদেশে যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করে তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ মানুষের রয়েছে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট। চারপাশে, দেশে-বিদেশে কী ঘটছে, সেগুলো ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, গুগলসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাত্ক্ষণিকভাবে পেয়ে যাচ্ছে সবাই। এমনও কিছু আছে যা ভাইরাল হওয়ার নয় তাও ভাইরাল হচ্ছে। আর তাতেই হচ্ছে ক্ষতি।
সন্তান যদি সাইবার বুলিংয়ের (cyberbullying) শিকার হয়, যেমন—অনলাইনে (গেম খেলতে গিয়ে বা বিশেষ ওয়েবসাইটে অথবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্ল্যাটফরমে) বিরূপ মন্তব্যের, গালাগালি, বর্ণবাদী, অভদ্র বা অশ্লীল ভাষার প্রয়োগ, যৌনতাবিষয়ক মন্তব্যের শিকার হয় যা সন্তানের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে, যা অনেক সময় সন্তানকে হতাশায় নিমজ্জিত করতে পারে, লেখাপড়ার-খেলাধুলার প্রতি অনীহা হতে পারে এমনকি ইনসমনিয়া থেকে শুরু করে আত্মহত্যার প্রবণতা পর্যন্ত তৈরি হতে পারে। তাহলে যে (অপরাধী) সাইবার বুলিং করছে, তাকে প্রতি-উত্তর (reply) না দিয়ে অপরাধীর আইডি রিপোর্ট করতে হবে ও ব্লক করতে হবে এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। সন্তানকে মানসিকভাবে উজ্জীবিত রাখতে হবে যাতে সে মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে ও হতাশাগ্রস্ত না হয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, সারা বিশ্বেই বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের একটা বড় অংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে।
ছদ্মবেশে বখাটেপনা ও উত্ত্যক্ত করা থেকে শুরু করে সামাজিক মাধ্যমে অহরহই হচ্ছে হ্যাকিং, ঘটছে ব্ল্যাকমেইলের মতো নানা ঘটনা। বাংলাদেশ ও ভারতে এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। অনেক সরলমনা বাবা-মা তাদের সন্তানদের আরো বেশি আধুনিক করতে অল্প বয়স থেকেই ইন্টারনেটে অভ্যস্ত করে তুলছেন; কিন্তু ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহার যে সন্তানের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে তা একবারও খেয়াল করছেন না। আমাদের শিশুরা ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগতের অপব্যবহারের প্রধান শিকার। কারণ সীমাহীন কৌতূহল নিয়ে নতুন কিছু জানার আগ্রহে তারা ইন্টারনেট ব্যবহারে আগ্রহী হচ্ছে; কিন্তু এর অনিরাপদ ব্যবহার তাদের নিরাপত্তাকেও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতনতা ও সতর্কতা জরুরি। এই সচেতনতা সৃষ্টিতে সমাজ ও রাষ্ট্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই ভার্চুয়াল জগতের নানা প্রভাব নিয়ে চিন্তা-গবেষণা হচ্ছে। সমাজ ও দেশের ভিন্নতায় এর প্রভাবও ভিন্ন ভিন্ন। বাংলাদেশ ও ভারতের শিশু-কিশোরদের মধ্যে এখন যে প্রবণতাটি বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় তা হলো বাস্তব জগতের সঙ্গে তাদের দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। শিশু-কিশোররা মাঠের চেয়ে ফোন-কম্পিউটারের গেমসেই বেশি আসক্ত থাকছে। ফেইসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভার্চুয়াল বন্ধুরাই যেন তাদের সবকিছু। তাদের কাছে মানসিক বন্ধনের তুলনায় ডিজিটাল বন্ধনের প্রাধান্য বেশি। সুখ-দুঃখের ভাগাভাগি করতেও তাদেরকে এখন ফেসবুকের সাহায্য নিতে হয়। সরাসরি কথা না বলে ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে তারা ভাব আদানপ্রদান করে। এসব ক্ষেত্রে আমাদের সবাইকেই যথেষ্ট সর্তকতা এবং সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। সাইবার অপরাধ এবং ভার্চুয়াল জগতের অপব্যবহার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আমাদের নিজেদের সচেতন থাকা। আমাদের সবার সতর্কতা এবং সাবধানতাই পারে একটি নিরাপদ সাইবার পরিবেশ তৈরি করতে এবং ভার্চুয়াল জগতের অপব্যবহার থেকে নিজেদের রক্ষা করতে।
n লেখক : ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
