করোনা ও দুর্যোগে বাংলাদেশ নৌবাহিনী

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২২:০০

করোনা প্রাদুর্ভাব রোধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে অসামরিক প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তার লক্ষ্যে ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী গত ২৪ মার্চ ২০২০ হতে মোতায়েন করা হয়েছে। এর আওতায় উপকূল অঞ্চলে নিয়োজিত হয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে নৌবাহিনী। নৌ কন্টিনজেন্টসমূহ চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের উপকূলীয় ও দ্বীপ অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, সন্দেহভাজন ও সংক্রমিতদের হোম কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশনে থাকা নিশ্চিতকরণ এবং এর সঙ্গে সঙ্গে মাইকিংয়ের মাধ্যমে নিয়মিত হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহার, বিভিন্ন নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ প্রদান, দুস্থদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম নিরলসভাবে পরিচালনা করছে।

অন্যদিকে, দেশব্যাপী সংক্রমণ রোধ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ঢাকা, খুলনা ও চট্টগ্রামের শহর ও প্রত্যন্ত এলাকার রাস্তাঘাট, ফুটপাথ ও আশেপাশের পরিবেশ জীবাণুমুক্ত রাখতে জীবাণুনাশক ছিটানো, এলাকাবাসীদের চিকিত্সা সহায়তা প্রদানসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক কাজ করে যাচ্ছে নৌসদস্যগণ। করোনা মোকাবিলায় নৌবাহিনীর জন্য বরাদ্দকৃত রেশন থেকে অসহায়দের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের সঙ্গে সঙ্গে নৌবাহিনীর সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের এক দিনের বেতন কর্তন করে ৪ কোটি পঞ্চাশ লাখ টাকা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও ঢাকা, খুলনা ও বরিশালের হতদরিদ্র ও দুস্থদের নিজস্ব তহবিল এবং নৌসদস্যদের ব্যক্তিগত অনুদান থেকে প্রায় প্রতিদিনই সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। এই তহবিল ও অনুদান থেকে ইতিমধ্যে উক্ত অঞ্চলসমূহে প্রায় ৬৭ হাজার অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের মধ্যে খাদ্যসহায়তা ও ৯ হাজারের অধিক পরিবারকে প্রস্তুতকৃত খাদ্য ও ইফতার/সেহরি বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি, নিজ দেশের দায়িত্ব পালন করার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবেশী দেশ মালদ্বীপেও নৌবাহিনী বাড়িয়ে দিয়েছে সৌহার্দের হাত। নৌবাহিনী জাহাজ ‘সমুদ্র অভিযান’ মালদ্বীপ প্রবাসী বাঙালিদের জন্য পৌঁছে দিয়েছে প্রয়োজনীয় চিকিত্সা ও নিরাপত্তাসামগ্রী। এর মধ্যে রয়েছে ২০ হাজার পিস পিপিই, ৫ হাজার পিস হ্যান্ড স্যানিটাইজার, ৯৬০ পিস নিরাপত্তা চশমা, ৪০ কার্টন জরুরি ওষুধ ও প্রায় ৮৫ টন খাদ্যসামগ্রী।

করোনার এই দুর্যোগে সারা বিশ্ব যেখানে সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে ভয়াল ঘূর্ণিঝড় ‘আম্ফান’। কিন্তু এই মহামারির মধ্যেও ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় থেমে থাকেনি নৌবাহিনীর কর্মতত্পরতা। নৌবাহিনীর সদস্যরা ঘূর্ণিঝড়ের প্রস্তুতি ও পরবর্তী উদ্ধার, ত্রাণ ও চিকিত্সা সহায়তায় ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করে। ঘূর্ণিঝড়ের আগাম প্রস্তুতি হিসেবে উপকূলীয় অঞ্চলের জনগণকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে খুলনা, সাতক্ষীরা, বরগুনা, বাগেরহাট ইত্যাদি জেলায় অসামরিক প্রশাসনকে সহায়তাসহ ব্যাপক প্রচারণা চালায়। পরবর্তীতে, ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সমুদ্র ও উপকূলীয় এলাকায় নৌবাহিনীর ২৫টি যুদ্ধজাহাজ, মেরিটাইম পেট্রোল এয়ার ক্র্যাফ্ট এবং হেলিকপ্টার দ্রুততম সময়ে জরুরি উদ্ধার, ত্রাণ ও চিকিত্সা সহায়তায় নিয়োজিত করা হয়। এরই আওতায়, সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরের গাবুরাসহ খুলনা, ভোলা, বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুরসহ উপকূলীয় জেলার দুর্গত এলাকাগুলোতে জাহাজ ও নৌ কন্টিনজেন্টের মাধ্যমে জরুরি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় খাদ্যসামগ্রী, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, স্যালাইন ও অন্যান্য সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়।

এভাবে শুরু থেকেই বাংলাদেশ নৌবাহিনী এই বৈশ্বিক বিপদে নিরলসভাবে দেশের মানুষের সেবায় নিয়োজিত রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও কাজ করে যাবে। আশা করা যায় শিগিগরই করোনা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি ঘটবে ও সব নাগরিক ফিরে পাবে তাদের পূর্বের কর্মচঞ্চল দিনগুলো। আতঙ্ক নয় বরং সচেতনতার মাধ্যমে সবাইকে দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হবে। সরকারের গতিশীল নির্দেশনা বাস্তবায়নে ধৈর্য ও মানবিকতা সহকারে সবাই একনিষ্ঠভাবে কাজ করলে এই বৈশ্বিক মহামারি ও অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ নিশ্চয় সফল হবে।

n লেখক :সাবেক সরকারি কর্মকর্তা