মাদক ব্যবসায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেফতারের পর কথিত বন্দুকযুদ্ধে দুই ভাই নিহতের ঘটনায় কক্সবাজারের টেকনাফ থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের আদালতে একটি মামলা করা হয়েছে। একই মামলায় আরো চার পুলিশ সদস্যকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। মামলার আরজিতে তাদের বিরুদ্ধে ৮ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে দুই ভাইকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এদিকে, টেকনাফ উপজেলার হোয়াইকং ইউনিয়নে মুছা আকবর (৩৫) ও সাহাব উদ্দিনকে ক্রসফায়ারে হত্যার অভিযোগে প্রদীপ কুমার দাশসহ ৫৩ জনের বিরুদ্ধে আরো দুটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। গতকাল বুধবার দুপুরে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (টেকনাফ-৩) হেলাল উদ্দীনের আদালতে এ দুই মামলার আবেদন করা হয়েছে। নিহত মুছা আকবরের স্ত্রী শাহেনা আকতার ও সাহাব উদ্দীনের বড় ভাই হাফেজ আহমদ বাদী হয়ে দুই মামলার আবেদন করেন। গতকাল বুধবার রিনাত সুলতানা শাহীন নামে এক নারী তার দুই ভাইকে হত্যার অভিযোগে চট্টগ্রামের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কামরুন্নাহার রুমীর আদালতে মামলাটি দায়ের করেছেন। আদালত মামলা গ্রহণ করে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন বাদীর আইনজীবী এএম জিয়া হাবীব আহসান।
নিহত আমানুল হক হারুন ও আজাদুল হক আজাদ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের ফকিরপাড়া এলাকার আমিনুল হকের ছেলে। মামলায় অভিযুক্তরা হলেন—ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, একই থানার এসআই ইফতেখারুল ইসলাম, কনস্টেবল মাজাহারুল ইসলাম, দ্বীন ইসলাম ও আমজাদ হোসেন। একই মামলায় অজ্ঞাতনামা আরো পাঁচ-ছয় জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
আদালত সূত্র জানায়, রিনাতের বড় ভাই আমানুল হকের মোবাইল সার্ভিসিংয়ের দোকান ছিল। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতিতে লকডাউন শুরুর পর দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমানুল পেয়ারার চাষ শুরু করেন। ছোট ভাই আজাদ বিদেশে থাকতেন। গত রমজানের সময় তিনি দেশে ফেরেন। গত ১৩ জুলাই রাত সাড়ে ৭টার দিকে আমানুলকে এবং ১৫ জুলাই দুপুর ২টার দিকে আজাদকে চন্দনাইশ থানা পুলিশের সহযোগিতায় টেকনাফ থানা পুলিশ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। পুলিশের অভিযোগ: তারা মাদক ব্যবসায়ী। তাদের ছাড়াতে ৮ লাখ টাকা লাগবে। টাকা দিতে না পারায় তাদের মাদক ব্যবসায়ী উল্লেখ করে টেকনাফ থানা পুলিশ ক্রসফায়ারে হত্যা করে। ১৬ জুলাই কক্সবাজার সরকারি হাসপাতালের মর্গে গিয়ে দুই ভাইয়ের লাশ শনাক্ত করে পরিবারের সদস্যরা।
আইনজীবী জিয়া হাবীব আহসান জানান, চট্টগ্রামের আনোয়ারা সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে অভিযোগ তদন্ত করে ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
কক্সবাজারে একটি মামলায় হোয়াইক্যং ফাঁড়ির ইনচার্জ মশিউর রহমানকে প্রধান ও প্রদীপ কুমার দাশকে ২ নম্বর এবং অন্য মামলায় এসআই দীপক বিশ্বাসকে প্রধান এবং ওসি প্রদীপকে ৩ নম্বর আসামি করা হয়।
নিহত মুছা আকবরের মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি হোয়াইক্যং ইউনিয়নের খারাইঙ্গ্যা ঘোনায় মুছা আকবরের বড় ভাই আলী আকবরের বাড়ি পুড়িয় দেয় টেকনাফ থানার একদল পুলিশ। এ ঘটনায় কক্সবাজার প্রেসক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলন করে তাদের পরিবার। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে গত ২৮ মার্চ রাতে আবু মুছাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে ক্রসফায়ার না দেওয়ার কথা বলে মুছার পরিবারের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। ৩ লাখ টাকা নিয়েও ঐ দিন ভোরে মুছা আকবরকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
বাদী পক্ষের আইনজীবী রিদুয়ান আলী বলেন, থানায় এ সংক্রান্ত কোনো মামলা হয়েছে কি না তা আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে জানাতে টেকনাফ থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। অন্যদিকে নিহত সাহাব উদ্দীনের মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, ২০১৯ সালের ১৭ এপ্রিল টেকনাফ থানার এসআই দীপক বিশ্বাসের নেতৃত্বে একদল পুলিশ সাহাব উদ্দীনকে তার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। পরে ক্রসফায়ারে না দেওয়ার কথা বলে তার পরিবার থেকে ৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়। কিন্তু পরিবার ৫০ হাজার টাকা দেয়। কিন্তু আরো ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা না দেওয়ায় ২০ এপ্রিল রাতে কাঞ্জরপাড়া ধানখেতে সাহাব উদ্দীনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ সংক্রান্ত কোনো মামলা হয়েছে কি না তা আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে আদালতকে জানাতে টেকনাফ থানার ওসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
