আইন তো কাজির গরু নহে

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:২৩

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে দ্রুত বিকাশমান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ভূমিকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। বলা যায়, এই সকল প্রতিষ্ঠানের বিকাশের সূত্র ধরিয়াই উচ্চশিক্ষার্থে শিক্ষার্থীদের বিদেশে যাইবার হার তুলনামূলক কমিয়া আসিয়াছে। ইহাতে অনেকে মনে করেন, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হইতেছে। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু অংশ যদি দিনের পর দিন আইন অমান্য করিয়া চলে এবং বিশ্বমানের শিক্ষাকার্যক্রম হইতে শত যোজন পথ দূরে থাকে, তাহা হইলে বহু ক্ষেত্রেই তাহা হাজার হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন লইয়া ছিনিমিনি খেলা ছাড়া আর কিছু নহে।

আমরা স্পষ্ট করিয়াই বলিতে চাই, দেশের বেশ কিছু অত্যন্ত মানসম্পন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরা জাতীয় উন্নয়নে প্রভূত অবদান রাখিয়া চলিতেছেন। কিন্তু যাহারা মান এবং আইনের তোয়াক্কা করিতেছে না, তাহাদের জন্য সমগ্র খাতটিই বদনামের শিকার হইতেছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদ হইতে জানা যায়, দেশে বর্তমানে ১০৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন রহিয়াছে। এইগুলির মধ্যে বর্তমানে চালু রহিয়াছে ৯৬টি। দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যুগ শুরু হয় ১৯৯২ সাল হইতে। অন্যান্য দেশে যেমনটি ঘটিয়াছিল, আমাদের দেশেও ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গজাইয়া উঠে। প্রায়শই এই ধরনের অভিযোগ চালু ছিল যে, মূলত অর্থ রোজগারের লক্ষ্যে কিছু প্রতিষ্ঠাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনা করিতেছে। যদিও নিয়ম অনুযায়ী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে হইতে হইবে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। ১৯৯২ সালের পর ১৯৯৮ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার আইনটি সংশোধিত হয়। সর্বশেষ নূতন করিয়া আইন প্রণয়ন করা হয় ২০১০ সালে। জানা যায়, ২০১০ সালের পূর্বের আইনে ৫২টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। সর্বশেষ আইন অনুযায়ী অনুমোদনের ১২ বত্সরের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাইবার বাধ্যবাধকতা রহিয়াছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণে ন্যূনতম এক একর এবং অন্যান্য এলাকায় কমপক্ষে দুই একর অখণ্ড জমি থাকিবার নিয়ম রহিয়াছে। এই সকল বিশ্ববিদ্যালয়কে ২০১০ সাল হইতে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাইতে কয়েক দফা আলটিমেটাম বাঁধিয়াও দেওয়া হয়। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাইবার ক্ষেত্রে সময় বাঁধিয়া দিয়াছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তখন বলা হইয়াছিল, যেই সকল বিশ্ববিদ্যালয় এই নির্দেশ পালন করিতে পারিবে না, সেইগুলিতে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করিয়া দেওয়া হইবে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে, আইনকে যেন বিশেষ তোয়াক্কা না করিলেও চলে তাহাদের!

মনে রাখিতে হইবে, যেই সকল কারণে বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশ ঘটিয়াছিল সেইগুলির মধ্যে প্রধান দুইটি কারণ হইল—উচ্চশিক্ষার বর্ধিত চাহিদা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পক্ষে মেটানো সম্ভব হইতেছিল না এবং সরকারি তহবিলের অভাব অর্থাত্ দ্রুত বর্ধনশীল চাহিদা পূরণে যেই পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন ছিল, সরকারের পক্ষে বাজেটে তাহা বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব না হওয়া। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অনেকে মনে করেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহিত বহু ক্ষেত্রেই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীরা থাকেন বিধায় তাহারা অনেক নিয়ম ও আইন দিনের পর দিন পাশ কাটাইয়া যাইতে পারিতেছে। কিন্তু যেই সকল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সত্যিকার অর্থে সকল নিয়ম মানিয়া সুনামের সহিত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করিতেছে, তাহারাও এই বদনামের ভাগীদার হইতেছে। আইন তো কাজির গরু নহে যে কেবল কাগজে থাকিবে। ইহা মানিতেই হইবে।