বেশ কিছু দিন আগে একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে রাজধানীতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তাগণ অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন যে, আমরা বিপুল সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাতে চাই; কিন্তু কার্যকর পরিকল্পনার অভাবে তরুণদের অনেকেই এখন বেকার হয়ে বসে আছে। তরুণ জনসংখ্যার ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ কোনো কাজে নিয়োজিত নেই। এমনকি তারা কোনো ধরনের প্রশিক্ষণও নিচ্ছেন না। ফলে তারা সম্পূর্ণ অলস অবস্থার মধ্যে সময় অতিবাহিত করছেন। এটা কোনোভাবেই দেশের জন্য কল্যাণকর নয়। এটা বাংলাদেশের টেকসই অর্থনীতির জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশ বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করছে; কিন্তু বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষীয় পর্যায়ে উদাসীনতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা একটি জাতির জীবনে একবারই আসে। আবার অনেকেই মনে করেন, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা একটি জাতির জীবনে হাজার বছরে একবার আসে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা একটি জাতির জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলে এবং এই অবস্থা অতিক্রান্ত হলে সেই জাতির অবস্থা কেমন হয় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে জাপান। জাপান দীর্ঘ ৪৪ বছর ধরে বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসেবে অবস্থান করছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কয়েক বছর পর জাপানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সূচনা হয়। তারা দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করতে থাকে। মারাত্মকভাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ জাপান অর্থনৈতিক উন্নয়নের শিখরে উন্নীত হয়; কিন্তু এই অবস্থা চিরস্থায়ী হয় নি। এক জাপান ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সুবিধা হারাতে শুরু করে। কয়েক বছর আগে জাপান চীনের কাছে তাদের অর্থনৈতিক আধিপত্য হারিয়েছে। জাপানে বর্তমানে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে গেছে। বাংলাদেশ ২০০০ সালে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এবং তা অব্যাহতভাবে ২০৩০-২০৩৫ সাল পর্যন্ত এই অবস্থা চলতে থাকবে বলে অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নতি অর্জন করছে—এটা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না; কিন্তু সেই উন্নয়ন কি পরিকল্পিতভাবে হচ্ছে? উন্নয়নের সুফল কি সবাই ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভোগ করতে পারছে? বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিমাপের একটি সহজ পন্থা হচ্ছে জিডিপি প্রবৃদ্ধি। অর্থাত্ একটি দেশ কতটা উন্নতি অর্জন করছে তা পরিমাপ করা হয় দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে। এটাই এখনো বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন পরিমাপের গ্রহণযোগ্য পন্থা; কিন্তু শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে একটি দেশের সঠিক উন্নয়ন পরিমাপ করা যায় না। জিডিপি প্রবৃদ্ধি যদি কর্মসংস্থানমূলক না হয় সেই প্রবৃদ্ধি জনকল্যাণে আসে না। সরকারি হিসাব মোতাবেক, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে; কিন্তু বাংলাদেশ যে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে তার গুণমান নিয়ে অনেকের মনেই সংশয় রয়েছে। এটা কি কর্মসংস্থানমূলক প্রবৃদ্ধি, নাকি কর্মসংস্থান বিহীন প্রবৃদ্ধি? কর্মসংস্থানমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে হলে তা আসতে হবে রিয়েল সেক্টর বা উত্পাদন মূলক সেক্টর থেকে; কিন্তু তা কি আসছে? যেভাবে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে কর্মসংস্থান কেন বাড়ছে না? উচ্চ মাত্রায় কর্মসংস্থান হতে হলে অবশ্যই ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সরকারি খাতে বিনিয়োগ সাম্প্রতিক সময়ে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে; কিন্তু ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের আনুপাতিক হার তেমন একটা বাড়ছে না। সরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ার মাধ্যমে যে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয় তা অধিক মাত্রায় কর্মসংস্থানমূলক নয়। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মেয়াদে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ জিডিপির ২৮ শতাংশে উন্নীত করার কথা ছিল; কিন্তু এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। সরকারি খাতের বিনিয়োগ পর্যাপ্ত পরিমাণে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে না বরং তা কেবল দুর্নীতির জন্ম দেয়। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য সবার আগে প্রয়োজন বিনিয়োগবান্ধব একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা; কিন্তু আমরা সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হচ্ছি। বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করা একটি বড় শর্ত। আংকটাডের বিনিয়োগ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পরিমাণ বৈদেশিক বিনিয়োগ আহরণ করতে পেরেছে। মিয়ানমারে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সঙ্গে সঙ্গে জাতিগত সংঘাতও বিদ্যমান। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির একটি অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে সুশৃঙ্খল ব্যাংকিং ব্যবস্থা; কিন্তু আমাদের দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
কয়েক বছর আগে এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে মোট বেকারের সংখ্যা হচ্ছে ২৬ লাখ। বেকারের হার নির্ধারণে যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে তা আমাদের দেশের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে না। অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন, দেশে বেকারের সংখ্যা ৪ কোটির বেশি। করোনা ক্রান্তিকালে দেশে বেকারের সংখ্যা হুহু করে বাড়ছে। যারা বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত রয়েছেন তাদের অনেকেই কর্মচ্যুত হয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে দেশের মোট জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৩১ লাখ ৭৮ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। দেশে ৭০ লাখ এসএমই উদ্যোক্তা আছেন। এদের বেশির ভাগই বর্তমানে করোনা সংক্রমণের কারণে বেকার হয়ে আছেন। সরকার চলতি অর্থ বছরে ব্যাংকিং সেক্টর থেকে ৮৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেবে বলে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বছর শেষে এটা আরো অনেকটাই বৃদ্ধি পেতে পারে। এই অবস্থায় ব্যক্তি খাতে ব্যাংকঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে কমে যেতে পারে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জরিপে দেখানো হয়েছে, করোনা ভাইরাস সংক্রমণজনিত কারণে দেশের ৬৩ শতাংশ শ্রমিক মে মাসের বাড়িভাড়া দিতে পারেন নি। ৯৫ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় কমে গেছে। ৬২ শতাংশ ক্ষুদ্র আয়ের মানুষ তাদের জীবিকা হারিয়েছেন। আন্তর্জাতিক পর্যটন সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী পর্যটন খাতে ৫ কোটি মানুষ চাকরি হারাবে। ৩৫ শতাংশ হোটেলের আয় কমে যাবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকেই কর্মচ্যুত হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। স্থানীয়ভাবে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা না গেলে বেকার সমস্যা আরো জটিল হবে। বাংলাদেশে যারা তুলনামূলক কম শিক্ষিত তাদের মধ্যে বেকারের সংখ্যা আনুপাতিক হারে কম। বেকার যুবশক্তির ৪৬ শতাংশই বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ ডিগ্রিধারী। ৫৬ শতাংশ বেকার জনগোষ্ঠীর বয়সসীমা ১৫ থেকে ২ বছর। যারা বিভিন্নভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে নিচ্ছেন তারাও প্রত্যাশার চেয়ে কম বেতন পাচ্ছেন। বাংলাদেশের এসএমই খাতে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে; কিন্তু করোনা সংক্রমণজনিত কারণে এই খাতটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। করোনা-উত্তরকালে বাংলাদেশ হয়তো আবারও দ্রুত উন্নয়নের পথে ধাবিত হবে। অর্জন করবে উচ্চ প্রবৃদ্ধি; কিন্তু সেই গ্রোথ হতে পারে জবলেস গ্রোথ। জবলেস গ্রোথ কতটা ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে তা একমাত্র সময়ই বলতে পারবে।
n লেখক :অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক
