ক্রিকেট নয়, উন্নয়ন টুর্নামেন্ট

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:১৯

মাহমুদ মেনন

বাংলাদেশ বনাম ভারত বনাম পাকিস্তান। তিনটি দেশের নাম একসঙ্গে এভাবে উচ্চারিত হলে যে কারোই মনে হবে ক্রিকেট নিয়ে কথা হচ্ছে। বিশ্ব ক্রিকেটের দৌড়ে ভারত পাকিস্তান বহু আগে থেকেই প্রতিদ্বন্দ্ব্বী। কিন্তু বাংলাদেশ এখন আর নতুন কোনো নাম নয়। এক্কেবারে পাকা প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু ক্রিকেট নিয়ে কথা বলতে এই লেখা নয়। সাম্প্রতিক সময়ে রাজনীতির বাইরে অর্থনীতি, সমাজ, প্রকৃতি, পরিবেশ, প্রতিবেশ সর্বোপরি মানুষ ও মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে বিশ্বে মানচিত্রের দেশগুলো নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই যে এক কাতারে তিনটি দেশের নাম উচ্চারণ, সে বাংলাদেশ সৃষ্টির সমান পুরোনো। তবে তা ছিল রাজনৈতিক। পাকিস্তান ছিল শোষক, তাদের হটিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। ভারত মিত্রশক্তি হিসেবে সহায়তা করেছে। কিন্তু এখন তিনটি দেশের নাম যখন এক আলোচনার টেবিলে ওঠে, সে আঞ্চলিক ফোরাম কিংবা আন্তর্জাতিক, তখন গুরুত্ব পায় তিন দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়। ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশ আকারে বৃহত্, বৃহত্ তার অর্থনীতি। হ্যাঁ ব্রিটিশরা চুষে নিয়েছে ভারতবর্ষ, তার পরেও যা রেখে গেছে, সেও কম নয়। কিন্তু বাংলাদেশ? ব্রিটিশদের ফেলে যাওয়া যা ছিল তাও শুষে নিয়েছে পাকিস্তান। দেশটিকে ফেলে রেখে গেছে এক তলাবিহীন ঝুড়ি করে। সেই দেশটি ৫০ বছরে এখন সমৃদ্ধির দেশ, বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে চলা এক জাতি।

বাংলাদেশ বনাম ভারত বনাম পাকিস্তান এই শব্দ পাঁচটিকে ঘিরে এখন কত প্রতিদ্বন্দ্বিতার খবর আসে।

বিষয়টিকে টাইমস অব ইন্ডিয়া বেশ মজা করেই সামনে এনেছে, তার সাম্প্রতিক এক ইনফোগ্রাফে। লড়াইয়ের নাম দিয়েছে ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপ। দুটি দেশ তাদের স্বাধীনতার ৭৩ বছরে। আরেকটি ৪৯ এ। তো এমনই স্বাধীনতা কাপ টুর্নামেন্টে অন্তত ১৪টি বিষয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখানো হয়েছে। যার মধ্যে—

* বাংলাদেশ সাতটি বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখে শীর্ষে রয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ছয়টি বিষয়ে।

* ভারত ছয়টি বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।

* আর পাকিস্তান এগিয়ে রয়েছে একটি বিষয়ে।

গড় আয়ু (বাংলাদেশ শীর্ষে)

প্রথমেই আসুন গড় আয়ু প্রসঙ্গে। বাংলাদেশ ৭২.৩ বছর, ভারত ৬৯.৪ বছর, পাকিস্তান ৬৭.১ বছর। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি (বাংলাদেশ শীর্ষে)

বাংলাদেশ ১১৬.৬ শতাংশ, ভারত ১১২.৯ শতাংশ, পাকিস্তান ৯৪.৩ শতাংশ । (তথ্যসূত্র :বিশ্ব উন্নয়ন সূচক)

জাতিসংঘ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা—এমডিজি নির্ধারণের পর তা অর্জনে এই খাতে বড় সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। সেই থেকে এগিয়েই চলেছে।

শিশুমৃত্যুর হার (বাংলাদেশ শীর্ষে) প্রতি ১ হাজার শিশুতে বাংলাদেশে ২৫.১ শিশু মারা যায়, যেখানে ভারতে ২৯.৯, পাকিস্তানে ৫৭.২ জন। (তথ্যসূত্র :বিশ্ব উন্নয়ন সূচক ২০১৮)।

নিরাপদ শৈশব (বাংলাদেশ সেরা),

মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টির বিবেচনায় এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত শিশুর সংখ্যা বাংলাদেশে ৪.১ জন, ভারতে তা ৫.৭ আর পাকিস্তানে ৯.৭ জন। ৫-১৪ বছরের প্রতি ১ হাজার শিশুর মধ্য মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টিবঞ্চিত শিশু সবচেয়ে কম বাংলাদেশে। আর সবচেয়ে বেশি পাকিস্তানে। (তথ্যসূত্র :বিশ্ব উন্নয়ন সূচক ২০১৭)

মোট জাতীয় সঞ্চয় (বাংলাদেশ শীর্ষে)

জিডিপির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ৩৩.৩ শতাংশ, ভারত ৩১.১ শতাংশ, পাকিস্তান ১৯.৩ শতাংশ । উচ্চমাত্রার সঞ্চয় মানেই হচ্ছে অপেক্ষাকৃত কম বিনিয়োগ ব্যয় যেটি অবশ্যই একটি দেশের উন্নয়নের অন্যতম দিক। (তথ্যসূত্র :বিশ্ব উন্নয়ন সূচক ২০১৮)

নারী গর্ভধারণ (বাংলাদেশ সেরা)

বাংলাদেশে এখন গড়ে প্রতিজন নারী দুটি করে সন্তান প্রসব করছেন। সে হিসাবে বলা চলে, পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি, ছেলে হোক মেয়ে হোক দুইটি সন্তানই যথেষ্ট—এই স্লোগান শতভাগ সফল। বাংলাদেশে প্রতিটি নারী গড়ে দুই বার গর্ভধারণ করে। সেখানে ভারতে ২.২ বার এবং পাকিস্তানে ৩.৫ বার।

সামরিক খাতে ব্যয় (মোট জিডিপির)

উল্লিখিত ছয়টি ছাড়া আরো একটি খাতে বাংলাদেশের অবস্থা অপেক্ষাকৃত ভারত কিংবা পাকিস্তানের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। তা হচ্ছে সামরিক খাতে ব্যয়। বাংলাদেশ মোট জিডিপির ১.৪ শতাংশ ব্যয় করছে সামরিক কিংবা প্রতিরক্ষা খাতে, যেখানে ভারত ২.৪ শতাংশ এবং পাকিস্তান ৪.২ শতাংশ ব্যয় করছে।

বাকি সাতটি বিষয়ের মধ্যে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পাঁচটিতে।

দারিদ্র্যসীমার নিচে মানুষ (বাংলাদেশ দ্বিতীয়)

ভারত ২১.৬ শতাংশ, বাংলাদেশ ২৪.৩ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ২৪.৩ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে।

সাক্ষরতার হারে (বাংলাদেশ দ্বিতীয়)

ভারত ৭৪.৪ শতাংশ, বাংলাদেশ ৭৩.৯ শতাংশ এবং পাকিস্তান  ৫৯.১ শতাংশ ।

বিদ্যুতায়ন (বাংলাদেশ দ্বিতীয়)

ভারতের ৯৫.২ শতাংশ মানুষ বিদ্যুতায়নের আওতায় এসেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে তা ৮৫.২ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ৭১.২ শতাংশ মানুষ বিদ্যুত্ পাচ্ছে।

বায়ুদূষণ (বাংলাদেশ দ্বিতীয়)

বছরে কার্বন নিঃসারণ সবচেয়ে কম করছে পাকিস্তান। ৫৮.৩ বাংলাদেশ ৬০.৯ ও ভারত ৯০.৯।

মাথাপিছু আয় (বাংলাদেশ দ্বিতীয়)

ভারতে এখন মাথাপিছু আয় ২১৫৯.১ ডলার, বাংলাদেশে ২০৬৪ ডলার এবং পাকিস্তানে ১১৮৫.৫ ডলার।

ভারত ২.৯ ট্রিলিয়ন, বাংলাদেশ ৩২০ বিলিয়ন (জুন ২০২০) এবং পাকিস্তান ২৫৬.৭৩ বিলিয়ন ডলার। এক্ষেত্রেও বাংলাদেশ দ্বিতীয়।

বিষয়টিকে স্বাধীনতা কাপের লড়াই হিসেবে তুলে ধরেছে টাইমস অব ইন্ডিয়া।

n লেখক :সাংবাদিক ও শিক্ষক