বোধিবৃক্ষ

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২১:১৯

আরশিনগর g বাহার উদ্দিন

আমরা নিঃসংকোচে এ কথা বলতে পারি, প্রখর আত্মসচেতন, স্থিতধী রাজনীতিকদের অন্যতম ছিলেন প্রণববাবু। ভারতকে, নেহেরু ঘরানার মতো তিনি যেভাবে যতটা চেনার চেষ্টা করেছেন, সমকালের অন্য কেউ তা করেননি। তবু কেন জানি, সমাজপড়ুয়া রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরাও তাকে ঘিরে বিশেষ চর্চা করেননি। তার আত্মনির্মাণের স্বপ্নকে যে প্রায় আশৈশব বহুমুখী চিন্তা, প্রচারবিমুখ জিজ্ঞাসা, বাঙালির মননের ঐতিহ্য, ভারতীয় বহুত্বের সাধনা, রবীন্দ্রচেতনা, আন্তর্জাতিকতা বোধ ছুঁয়ে থাকত, এসব অনেকেরই নজরে পড়েনি। তার রাজনীতি আর রাজনৈতিক বিচক্ষণতাই প্রধানত চর্চার বিষয় হয়ে ওঠে।

কবি মহম্মদ ইকবাল, দি রিকনস্ট্রাকশন অব রিলিজিয়াস থট ইন ইসলাম-এর শুরুতেই তার স্বভাবপ্রাজ্ঞ ভঙ্গিতে লিখেছিলেন, জন্মের পর থেকে মানুষ ক্রমশ বড় হয়ে উঠতে চায়। এটা তার স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যাস। আর ব্যক্তিপ্রতিভা আত্মতার নির্মাণের স্বপ্ন দেখে। সে খুঁজতে থাকে অসীমের সুন্দরকে। রবীন্দ্রনাথও মানুষের পূর্ণতার বিকাশ দেখেছেন আত্মশক্তির উদ্বোধনে। সমাজ সংগঠনে, গঠনশীল রাজনীতিতে এবং সৃজনকর্মে যারা অন্তর্দ্রষ্টা তাদের ক্ষেত্রে এই ধরনের উপলব্ধি সম্ভবত অধিকতর সত্য। বাঙালির সামাজিক ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ তো বটেই, বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের অন্যতম দিশারি স্বামী বিবেকানন্দও আমাদের সবার সামনেই গগণচুম্বী আদর্শ। প্রণববাবু ২০১২ সালের ২৫ জুলাই রাষ্ট্রপতির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের সংক্ষিপ্ত ভাষণ তার সামাজিক ভাবনাচিন্তা উল্লেখ করে সরাসরি জানাতে ভোলেননি, সুবিচারই হয়ে উঠুক ভারতীয় মহাজাতির অভিমুখ। তার নিজের শৈশব, ক্রম-উত্তরণ, রাজনীতির বিস্তার, নির্লিপ্ত নিষ্ঠা, আর নিরন্তর অধ্যবসায় কি প্রমাণ করে না তিনিও এই অশেষ পথের অবিচল, সচেতন যাত্রী ছিলেন? চরিত্রের এই বৈশিষ্ট্য, দৃঢ়তা, এখানে-ওখানে উচ্চারিত ইঙ্গিত, একটু-আধটু স্মৃতিচারণ এবং অন্যের বয়ান থেকেও কি আমরা জানতে পারি যে, বিশেষকে অতিক্রম করে ক্রমশ নির্বিশেষে সঙ্গী হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন তিনি? যে কোনো ব্যক্তি প্রতিভার বিকাশ শুরু হয় তার শৈশবে, প্রকৃতির রসদ সংগ্রহ করতে করতে, অথবা বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের ভেতর দিয়ে পরীক্ষিত হতে থাকে তার ভবিষ্যতের বাস্তবতা। প্রণববাবুর শৈশবে, ছাত্রজীবনের রাজনীতিতে, ব্যাংক জাতীয়করণের কঠিনতম পরিস্থিতিতে এবং পরেও নানা স্তরে দেশ-বিদেশের সংকটে তার সদর্থক ভূমিকা কি প্রমাণ করে না পারিপার্শ্বিকের কাঁটা সরিয়ে, অমোঘ, নৈর্ব্যক্তিক নির্মাণের রাস্তা বেছে নিয়েছিল তার ব্যক্তিত্ব?

পুজোর বেদিতে বসিয়ে, বিশেষণের পর বিশেষণ সাজিয়ে আড়াল করতে চাই না তার প্রজ্ঞাকে। এটা অন্যায়। এতে ম্লান হয়ে যায় ব্যক্তি সুষমা আর মানবিক বোধ ও বুদ্ধি।

কখনো সান্নিধ্যে এসে, কখনো দূর থেকে  তাকে দেখার চেষ্টা করেছি। তার অকৃত্রিম ব্যবহারে এবং পর্যবেক্ষণে যে পরিচয়, যে মুখ দেখার সুযোগ হয়েছে, তার মূল্যায়ন জরুরি। এখানে কেবল ব্যক্তি নন, সমষ্টির প্রতিনিধি আর সামাজিক প্রণববাবুই আমাদের প্রধান আকর্ষণ।

সান্নিধ্যের আলো

সেপ্টেম্বর অক্টোবর ১৯৮৩। প্রতিক্ষণ পত্রিকায়, অগ্নিগর্ভ পাকিস্তান ও ভারতের পাঞ্জাবকে নিয়ে এই লেখকের এর দুটি প্রচ্ছদ রচনা প্রকাশিত হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে খবর পেলাম, লেখা দুটি প্রণববাবু খুঁটিয়ে পড়েছেন। আলাপ করতে চান। কিন্তু নগণ্য, অপরিচিত এই তরুণের সে সুযোগ কোথায়? উনি শ্রীমতী গান্ধীর মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, দিল্লিকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ঘুরে বেড়ান, কলকাতায় এসে কোথায় থাকেন, আদি বাড়ি কোথায়, এসব জানি না, সব ব্যাপারেই আনপড়।

অক্টোবরে, শীত এসেও আসছে না। কালীপুজোর রাত। প্রতিক্ষণের সম্পাদক স্বপ্না দেবের বাড়িতে খিচুড়ি ভোজ খেতে গেছি। স্বপ্নাদি এসে কানে কানে বললেন, প্রণববাবু আসবেন, আলাপ করিয়ে দেব। আড়ষ্ট গ্রামীণ স্বভাব আমার। ভাবলাম, ওর মতো ভিআইপি থোড়াই আমাকে পাত্তা দেবেন। মিনিট কয়েক পর দেখি, ধুতি-পাঞ্জাবি পরা নাতিউচ্চ দেহের ফরসা মুখটি নিঃশব্দে হাজির। পুলিশের সাইরেন বাজল না, হইচইও চোখে পড়ল না, স্বপ্নাদি পরীক্ষার্থীর মতো প্রণববাবুর সামনে নিয়ে গিয়ে বললেন, এর নাম বাহার। হাসলেন, প্রাসঙ্গিক দু-একটা কথাই সেরেই বললেন, চলো দুজনে একসঙ্গে খেতে বসব। কম্পিটিশনে দেখা যাবে কে বেশি, কতক্ষণ খেতে পারে! এটা যে তার সৌজন্য, অনুজের প্রতি একধরনের স্নেহ তা বুঝতে পারিনি। প্রতিযোগিতার ঝুঁকি নিয়ে হাভাতের মতো খিচুড়ি গিলছি তো গিলছি। ওর দিকে খেয়াল নেই। হঠাত্ লক্ষ করলাম, উনি ওর আসনে নেই, উঠে পড়েছেন। দিল্লি ফিরে যাবেন। না বলেও চলে যেতে পারতেন, সামনে এসে বললেন, বাহার হরদম চালাও, মনে রেখো, আমি সকালে খেতে বসে রাতে কী খাব ভাবতে থাকি। ভাবলাম, আচ্ছা লোক তো, খাবার কম্পিটিশন শেষ হলো না, চলে যাচ্ছেন!

 বারবাঙ্কি থেকে ফেরার পথে

গ্রীষ্মকাল। ১৯৮৪। রাম-বাবরির নীরক্ত লড়াই তখন তুঙ্গে। প্রণববাবুর রাজ্যসভার সদস্য, স্বভাবত উদ্বিগ্ন। উত্তর  প্রদেশের তখনকার মুখ্যমন্ত্রী বীরবাহাদুর সিং, সম্ভবত অরুণ নেহেরুর পরামর্শে বন্ধ বাবরি মসজিদের তালা খুলে দিয়েছেন। বহু মানুষ ক্ষুব্ধ। বারবার পথে নামছেন। সৈয়দ শাহাবুদ্দিন (প্রয়াত এমপি) আর মুসলিম মজলিস-এ মোশাওয়ারাত প্রথমে লংমার্চ ডেকে বসলেন। পরে স্থগিত রেখে ‘কালা দিবস’ পালনের আহ্বান। উত্তর প্রদেশ অশান্ত। ফয়জাবাদ তার সহজাত শান্তি বজায় রাখল। বারবাঙ্কির ঈদগায় সমবেত হয়ে বিক্ষোভ দেখালেন মুসলিমরা। পিএসসি (উত্তর প্রদেশের আর্মড পুলিশ) নির্বিকার গুলি চালাল। মারা পড়লেন তার নিরস্ত্র। খবর পেয়ে লখনৌ হয়ে বারবাঙ্কিতে ছুটলাম। থমথমে পরিস্থিতি, নিহত-আহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে ফিরে এলাম দিল্লিতে। সৈয়দ শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে আলাপ আছে। মনে হলো, কথা বলা দরকার। দুপুরে ওর বাড়ি থেকে বেরিয়ে পার্লামেন্ট হাউজের সামনের রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, একা। আচমকা চোখে পড়ল প্রণব বাবু হেঁটে যাচ্ছেন, পরনে সাধারণ জামা-প্যান্ট, হাতে একটি ইংরেজি পেপার ব্যাক। ভাবলাম ’৮৩ সালে ক্ষণিকের আলাপ, সে কি আর মনে আছে? পাশ কাটিয়ে এড়িয়ে  যাওয়ার চেষ্টা করতেই থামিয়ে দিলেন, ‘কি বাহার, কোত্থেকে, কোথায় যাচ্ছ?’ ‘বারবাঙ্কি গিয়েছিলাম, এখন হোটেলে যাব।’ কথা বলতে বলতে এগোচ্ছি। সামনেই তালকাটরা রোড। ‘আমার কোয়ার্টারে চলো, একসঙ্গে খাব। আজও দুজনের খাবার কম্পিটিশন!’ কথাটা স্মরণে আছে তাহলে? আমি অবাক, বাড়ি ঢুকেই হাতমুখ ধুয়ে আমাকে নিয়ে সোজা ডাইনিং টেবিলে বসে পড়লেন। আবার ঐ একই কথা, ‘দুপুরে তো খাচ্ছি, রাতে কী খাব ভাবছি।’ মনে মনে হাসলাম। ‘খেতে থাকো’ বলেই উনি হাত ধুয়ে সামনে বসলেন। ততক্ষণে জেনে গেছি খাদ্যরসিক। পরিমিত আহার তার পছন্দ। একসময় শুভ্রাদি বেরিয়ে এলেন। চমত্কার মহিলা, গান করেন, ছবি আঁকেন, নিকট আত্মীয়ের মতো ব্যবহার। কিছুক্ষণ টেবিলে বসে রেস্ট নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লেন। আমার খাওয়াদাওয়া শেষ হলে ভাবলাম, প্রণববাবু নিশ্চয়ই বিশ্রাম নেবেন, উঠে পড়া উচিত। আটকে দিলেন, বসো গল্প করি। মুন্নি (শর্মিষ্ঠা) তখন ছোট, আলাপ হয়নি, দেখা যাচ্ছে ফোনে ব্যস্ত। গোটা বাড়ি একসময় নিস্তব্ধ হয়ে এলো, ঘর ভর্তি বইয়ের তাক, যেন একটি লাইব্রেরি। একপাশে সোফায় বসে  দুজনের আলাপ চলছে—পশ্চিম এশিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ভারতীয় রাজনীতি, সাহিত্য, দর্শন—বিচিত্র সব বিষয় নিয়ে। বয়সের ব্যবধান ভুলে সমবয়সির মতো কখনো বলছেন, কখনো শুনছেন। শিলং, গুয়াহাটি, ঢাকা আর কলকাতায় বহু মহান বিদ্যাদাতার  সংস্পর্শে এসেছি আমি। কিন্তু শঙ্খ ঘোষ, আবু সয়ীদ আইয়ুব আর আনিসুজ্জামান ছাড়া এত নিষ্ঠাবান শ্রোতার সঙ্গে কখনো দেখা হয়নি। আমার সশ্রদ্ধ আকর্ষণ, যোগাযোগ, এই দুই সাক্ষাতেই থেমে যেতে পারত, থামেনি, পরে, গত কয়েক দশক জুড়ে আরো প্রশস্ত হতে থাকে। তার প্রবল ব্যস্ততাকে অস্বীকার করে যখন-তখন ফোন করেছি। আমরা এ রকম অনেককেই জানি, ফোন বেজে যায়, ধরেন না, তাদের হয়ে অন্য কেউ ফোন ধরেন। রিসিভার তুলে জানিয়ে দেন, সাহেব বাথরুমে, অথবা মিটিংয়ে ব্যস্ত। এ ব্যাপারে প্রণববাবুকে স্বতন্ত্র বললে কম বলা হয়।  নিজে ফোন ধরে কথা বলতেন, সম্ভবত চেনা-অচেনা সবার সঙ্গে। দ্বিতীয়ত কঠিন পরিস্থিতিতেও আবদার যুক্তিযুক্ত ও সংগত হলে সাড়া দিতেন। এ রকম অনেক ঘটনার অন্যতম সাক্ষী এই লেখক।

ইতিহাসের ইচ্ছে পূরণ

বুদ্ধি আর হূদয়বৃত্তির সংযোগকে ইতিহাস গুরুত্ব দেয়, বিশেষ করে ব্যক্তি বিশেষের নির্মাণের প্রশস্ত, অপ্রশস্ত পথে। ইতিহাসের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নেই। সে প্রতিষ্ঠান নয়। রাষ্ট্রের তাঁবেদার নয়। একটি চলমান দর্শক। যার বড় হওয়ার কথা, নেতৃত্বের আসনে বসে যিনি তার সময়ের, ভবিষ্যতের নিশানা তৈরি করবেন, ইতিহাসের শিক্ষা তাকে সংযম আর যুক্তিময়তার মিশেলে অপরিহার্য, অপরিমেয় করে তোলে। এক সময়ে জনগণের ইচ্ছারই পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন তিনি। সাহিত্য অথবা সমাজবিদ্যা, চিত্রকলা অথবা বৃহত্তর সংস্কৃতি, রাজনীতি অথবা বিপ্লবে, মানববিদ্যার যে কোনো অঙ্গনেই এই কথা অনিবার্য সত্য। ব্যক্তিপ্রতিভার বিকাশে, প্রতিটি উত্তরণের পূর্ণ হয় ইতিহাস ছোঁয়ার স্বপ্ন। মিরাটির বঙ্গসন্তান প্রণব মুখার্জির হয়ে ওঠা, ক্রমাগত সর্বভারতীয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তার উজ্জ্বল বিচরণ সমাজের এ রকমই এক আকাঙ্ক্ষা পূরণ।

n লেখক :ভারতীয় সাংবাদিক; সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা