জুলফিকার বকুল
মানুষ কেবল চোখ দিয়েই দেখে না, এর পিছনে রয়েছে তার সক্রিয় মন ও মস্তিষ্ক। রয়েছে দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামত। মানুষ যা কিছু দেখে, শোনে এবং জানে সেটাকে সে নিজের অভ্যন্তরীণ মৌলিক চিন্তা ও ধ্যানধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল করে নেয়। অতঃপর সেই চিন্তা ও ধ্যানধারণার ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে তার জীবন পদ্ধতি। তাই পরিপূর্ণ জীবন পদ্ধতি গড়ে তুলতে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। সাধারণ অর্থে জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জনই হচ্ছে শিক্ষা।
করোনাকালে শিক্ষা কার্যক্রম যেমন ব্যাহত হচ্ছে তেমনি জীবনের নিরাপত্তা বিবেচনায় শিক্ষা কার্যক্রম গতিশীল রাখার বিকল্প ব্যবস্থাও খোঁজা হচ্ছে। আমাদের দেশেও পরীক্ষা পদ্ধতির বিকল্প ভাবনাসহ শিক্ষানীতির সংশোধনের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। পরীক্ষাকে আমরা সাধারণত পড়ালেখার শেষ ধাপ হিসেবে চিহ্নিত করি। আর এর ফল হিসেবে খাতা-কলমনির্ভর পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয়। এভাবে শিক্ষার্থীরা দিন দিন পরীক্ষানির্ভর হয়ে পড়ায় শিক্ষার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। পরীক্ষা একটি স্তর বা ধাপ পরিবর্তনের সিঁড়ি হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত জ্ঞানার্জন শুধুমাত্র পরীক্ষাকেন্দ্রিক হতে পারে না। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য শিক্ষার্থীর চেতনাকে নাড়া দিয়েছে বলে আমার বিশ্বাস। তিনি বলেছেন, ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টি, জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন এবং সুনাগরিক তথা বিশ্ব নাগরিক হওয়া।’
প্রকৃত আর সনদভিত্তিক শিক্ষা দুটোই আমাদের প্রয়োজন আছে। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষাই একটি কাঙ্ক্ষিত সনদপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে—এ কথা ভুলে গেলে চলবে না। একটি সনদ কেবল তার যোগ্যতা অর্জনের আশ্বাস দেয়, কিন্তু প্রকৃত শিক্ষায় কতটা শিক্ষিত হয়েছে—সনদ সেই নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
সময় এসেছে গতানুগতিক পরীক্ষাকেন্দ্রিক ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসার। প্রকৃত শিক্ষা অর্জন প্রতিটি শিক্ষার্থীর নিজের জীবনের জন্য প্রয়োজন। তাই ঘরে বসে বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি ও সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে পাঠোভ্যাস গড়ে তুলে ইতিবাচক লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার এখনই সময়। শুধু প্রয়োজন ইচ্ছাশক্তি ও দৃঢ় মনোবল। ঘরে বসেও শিক্ষক, সহপাঠী, গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম ইত্যাদি মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত জটিল বিষয়গুলো শেয়ার করে জেনে নেওয়া সম্ভব। স্কুল-কলেজ বন্ধ বলে পড়ালেখা বন্ধ থাকতে পারে না। তাই সময় অপচয় না করে নিজেকে দেশের সম্পদে পরিণত করা একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য। প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা পরীক্ষা না হওয়া কখনো নিয়মিত অধ্যয়নের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না। সময়কে ফাঁকি দেওয়া মানেই নিজেকে ফাঁকি দেওয়া। পৃথিবীতে কোনো সমস্যাই চিরস্থায়ী নয়। সমস্ত প্রতিকূলতাকে মাথায় নিয়েই সামনে এগুতে হবে।
প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য তার পরিবার হচ্ছে সবচেয়ে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আর পরিবারের প্রতিটি সদস্যই হচ্ছে একেক জন বড় শিক্ষক। তাই শিক্ষার্থীকে সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় সাপোর্টের মাধ্যমে তার আত্মোপলব্ধি জাগানো পরিবারের সদস্যদের গুরুদায়িত্ব।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক মেলবন্ধন শিক্ষাপদ্ধতিতে দুর্যোগকালীন এই সময়ে গতিশীলতা আনবে বলে আমার বিশ্বাস। বর্তমান সময়কে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে শিক্ষার্থীকে বই পড়ায় অনুপ্রাণিত ও উত্সাহিত করা জরুরি। আর এ কাজে একজন শিক্ষকের দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিসীম। পরিশেষে, শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রকৃত জ্ঞান অর্জন ও আত্মচেতনাকে উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে শিক্ষার্থীর নিয়মিত অধ্যয়ন হয়ে উঠুক প্রগতিশীল ও প্রজ্ঞাময়।
গাজীপুর
